শুক্রবার, মার্চ ২০, ২০২৬

অর্থনীতিতে শনির দশা, জনগণের দূর্ভোগ বাড়বে

আপডেট:

পাকিস্তানের মতো যেসব অর্থনীতি ঋণের ফাঁদে পড়েছে সেসব অর্থনীতি ফাঁদ কাটিয়ে ওপরে উঠতে পেরেছে তার উদাহরণ খুব কম। বাংলাদেশের অর্থনীতি তিন-চার বছর আগ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো অবস্থায় ছিল। আর এখন আমরা দ্রুতই ঋণের ফাঁদে আটকে যাচ্ছি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে কিছু লোন পেতে পারে। তবে অন্য উৎস থেকে পাবে না। যখন একটা অর্থনীতি ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে যায় তখন অন্যরা ঋণ দিতে চায় না। কারণ, তারা মনে করবে, বাংলাদেশ তো পরিশোধ করতে পারবে না। এই অবস্থায় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংকের মতো যারা আমাদের ছয় মাসে বা বার্ষিক হিসাবে ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও খরা দেখা দিতে পারে। দ্বিপক্ষীয় ঋণ পাওয়াও কঠিন। চীন থেকে হয়তো ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাও সম্ভব হবে না। ভারতের সঙ্গে অতিবন্ধুত্বের দাম দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মূলত এ কারণেই চীন আগের মতো এখন আর হাত খুলে আমাদের সহায়তা করবে না। ভারতের সঙ্গে অতিবন্ধুত্বের কারণে আরো বড় আকারের মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশকে। সব মিলিয়ে ফরেন এক্সচেঞ্জ, রিজার্ভ বাড়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিনিয়োগ যে বাড়বে তারও সম্ভাবনা নেই। শেয়ারবাজার যে ঘুরে দাঁড়াবে তাও অসম্ভব। সাপ্লাই চেইন আগের চেয়ে বাড়বে সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় রফতানি যদি বাড়ে সেক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে। তবে এ খাতেও দুঃসংবাদ আসছে। চলমান অস্থিরতায় রফতানি আটকে আছে শুল্কায়ন না হওয়ায়। এর ফলে আমরা রফতানি গন্তব্য হারাচ্ছি। তাদেরকে অনেককেই পরবর্তী সময়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। রফতানি না বাড়লে তো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে না। সরবরাহ কমার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। এখন যে ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে, আগামীতে এ সংখ্যা বাড়বে। হয়তো আরো ৫-১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে আসবে। কারণ মূল্যস্ফীতির অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি। আয়বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও নিম্নবিত্তের পর্যায়ে চলে যাবে। মোটাদাগে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি খাদের কিনারায় এসে পৌঁছেছে। দুই বছর আগে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল, সে সময় আমরা অনেকে চিন্তা করেছিলাম যে যুক্তিযুক্ত সংলাপের মাধ্যমে আমরা একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হব। কিন্তু সেটা হয়নি। বর্তমানে অর্থনীতির অবনমনের পেছনে রাজনৈতিক অবিশ্বাস দায়ী। একে অন্যকে দোষারোপের মাধ্যমে কখনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো যায় না, বিনিয়োগ আকর্ষণও করা যায় না। সামাজিক সংহতির দেশ হিসেবে আমাদের পরিচিত হতে হবে। সহিংসতার দেশ হিসেবে যদি মানুষ আমাদের দেশকে চিহ্নিত করে তাহলে ভবিষ্যতে এলসি খুলতেও আমাদের সমস্যা হবে। হয় বৈদেশিক মু্দ্রা দিয়েই এলসি খুলতে হবে, নয়তো কোনো তৃতীয় পক্ষ লাগবে গ্যারান্টি হিসেবে—বীমা কিংবা ব্যাংক উভয় ক্ষেত্রেই। সামগ্রিকভাবে ভয়াবহ দুর্যোগের দিকে অগ্রসর হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এটি বুঝতে হবে যে বর্তমানে যে অনিশ্চিত ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এর চেয়েও শোচনীয় পরিস্থিতি বয়ে আনতে পারে।

আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত