ব্যাংক রান ও অর্থ সংকট (আমানত খেয়ানত)
ব্যাংক রান হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যখন ব্যাংকগুলোর মধ্যে টাকার অর্থাৎ ক্যাশের সংকট দেখা যায়। এটি সাধারণত তখন হয়ে থাকে যখন গ্রাহকেরা অস্বাভাবিকভাবে টাকা উঠানো শুরু করে বিভিন্ন পরিস্থিতি বা বিপর্যয়ের কারণে।
প্রতিদিনই ব্যাংকে মানুষ অসংখ্য টাকা জমা রাখে। তার তুলনায় খুব নগণ্য টাকাই উঠানো হয়। ব্যাংক এই টাকার সবটুকু নিজেদের কাছে রাখে না। তারা এই টাকার কিছু অংশ বিভিন্ন ব্যবসা-বণিজ্য, সুদ ও আরো অনেক কাজে ব্যায় করে থাকে। তাই ব্যাংক নিজেদের কাছে বেশি টাকা জমা রাখতে পারেনা। তাছাড়া অনেক টাকা একসাথে রাখার অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। তাই প্রত্যেক ব্যাংকে দৈনিক কি পরিমাণ ক্যাশ রাখা যাবে তা পূর্ব নির্ধারিত থাকে কি পরিমাণ টাকা উত্তোলন হবে সেটার উপর অনুমান করে। আর বাকি টাকা বিভিন্ন কাজে লাগানো হয়।
যেহেতু ব্যাংক নিজেদের কাছে সীমিত পরিমাণ টাকা জমা রাখে সেহেতু অনেক মানুষ একসাথে টাকা উঠাতে আসলেই ঘটে ব্যাংক রান। ব্যাংক রান বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে। যেমনটা ঘটছে ইউক্রেনে ও রাশিয়ায়। ইউক্রেনে যখন যুদ্ধ শুরু হল মানুষগুলো ব্যাংক হতে তাদের টাকা তুলে ইউরোপে পালাতে শুরু করলো ফলে ব্যাংক হতে টাকা খালি হতে লাগলো।
অন্যদিকে ব্যাংক যাদের লোন দিয়েছিল এখন তাদের কাছ হতে টাকাও নেয়া যাবে না। ফলে অনেকে তার প্রাপ্য টাকা তুলতে পারবে না অন্যদিকে সম্পদের অভাবে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। বিপরীত চিত্র রাশিয়ায়- আবরোধের কারণে তাদের মুদ্রা প্রতিদিন নামছে, তাই সবাই টাকা তুলে ইলেকট্রনিকসসহ স্বর্ণও কিনে রাখছে যাতে পরবর্তীতে ইউরোপ বা অন্য কোথাও বিক্রি করতে পারে এই আশায়। এজন্য দেখুন বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রূপার দাম বাড়বে।
যখন ব্যাপক আকারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে বা মুদ্রার দাম কমতে থাকে তখন নিজেদের টাকার মান ঠিক রাখার জন্য জনগণ টাকা উঠিয়ে অন্যান্য জিনিস কিনে যেগুলোর মূল্য বেশি সময় স্থির থাকে যেমন স্বর্ণ। মোটকথা হল, ব্যাংক রান তখনই ঘটে যখন মানুষ ব্যাংকের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে পেলে।
ব্যাংকের ধোকা হলো তারা অন্যের টাকায় ব্যবসা করে (আমানতের খেয়ানত ফলে টাকা জমা থাকে। প্রাপ্যগ্রাহককে তার মূল টাকা দিতে পারে না,বা দিতে চায় না।মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। তা হলো মিথ্যা কথা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং আমানতের খেয়ানত করা।’ (বোখারি : ৩৩)
‘আমানত’ শব্দটি আরবি ‘আমনুন’ মূলধাতু থেকে বের হয়েছে। যার অর্থ ভরসা করা, আস্থা রাখা। অর্থাৎ কাউকে বিশ্বাস করে তার কাছে কোনো কিছু গচ্ছিত রাখলে তাকে আমানত বলে। আমানত রক্ষা করা অপরিহার্য দায়িত্ব। ইসলাম আমানত রক্ষার প্রতি অত্যন্ত জোর তাগিদ করেছে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের বিচার-মীমাংসা করবে তখন ইনসাফভিত্তিক মীমাংসা কর। আল্লাহ তোমাদের সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’ (সুরা নিসা : ৫৮)
আমানতের বস্তু পরিশোধ না করলে তাকে খেয়ানত বলে। খেয়ানত অত্যন্ত মারাত্মক গুনাহ। খেয়ানত করাকে নবীজি (সা.) মুনাফিকের আলামত সাব্যস্ত করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। তা হলো মিথ্যা কথা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং আমানতের খেয়ানত করা।’ (বোখারি : ৩৩)। মুসলিম শরিফের বর্ণনায় রয়েছে, ‘যদিও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং নিজেকে মুসলমান মনে করে।’ হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘এমন খুব কম হয়েছে যে, নবীজি (সা.) ভাষণ দিয়েছেন অথচ তাতে এ কথা বলেননি ‘যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই।
আর যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিয়মানুবর্তিতা নেই তার ধর্ম নেই।’ (মুসনাদে আহমদ : ১২৪০৬)।
যতই তারা চমকপদ কথা বলুক বা ইসলামের নাম ব্যবহার করুক আমানতের খেয়ানত হয়ে থাক ব্যাংকগুলোতে যা স্পষ্ট হয় আপদকালীন সময়ে।
আর আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয় দায়িত্ব বা আর্থিক ফাতেয়া দক্ষ , সাহসী,হকপন্হী আলেম দ্বারা নিয়ন্ত্রণ হয় না যে প্রকৃত
সত্য মানুষের কাছে স্পষ্ট হবে।
(সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষায় থাক। জিজ্ঞাসা করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা আমানত নষ্ট করণের শামিল। আর এমনটি করা হলে বুঝবে কেয়ামত সন্নিকটে।’ (বোখারি : ৫৯)



