বুধবার, এপ্রিল ১, ২০২৬

ব্যয় মেটাতে অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ ৮১ শতাংশই নিয়েছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে

আপডেট:

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা বেড়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বিগত সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে যে পরিমাণ ঋণ করে, তার ৮১ শতাংশই নিয়েছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে। এর পরিমাণ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর দেশি-বিদেশি উৎস মিলে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমনিতেই ত্রয়োদশ নির্বাচনপূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ তলানিতে নেমেছে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন তারা।
এবার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অতিদ্রুত ঋণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণের কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এর মধ্যে অন্যতম হলো- পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে সরকারের মূলধন সহায়তা। গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ওই ব্যাংকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়, যার বড় অংশই এসেছে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ধার করা অর্থের মাধ্যমে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারের রাজস্ব আয় আশানুরূপ না হলেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের অর্থের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের।প্রতিবছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট পেশ করে আসছে সরকার। এই ঘাটতি মেটানো হয় মূলত দুটি উৎস থেকেÑ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত। বৈদেশিক খাত থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাওয়া না গেলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয় সরকারকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি এবং সঞ্চয়পত্র খাত। এবার জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট দিয়েছে, সেখানে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদানসহ) ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে অনুদান বাদে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাওয়ার আশা করা হয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত সরকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তার সিংহভাগই নিয়েছে ব্যাংকব্যবস্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি এই সাত মাসে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ঋণ নিয়েছে ৭৩ হাজার ৩৫ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৯ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের চেয়ে এবার ব্যাংকঋণ নেওয়া প্রায় আটগুণ বেড়েছে। একই সময়ে অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্নচিত্র দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এ খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ঋণ নেওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়া হয়েছে ৮০ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। ফলে এবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।ঋণের এই প্রবণতার প্রভাব পড়েছে মোট স্থিতির ওপরও। ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জানুয়ারি শেষে ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা।অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এবার মোট নেওয়া ঋণের ১১ শতাংশেরও কম এসেছে বৈদেশিক উৎস থেকে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

তথ্যসুত্র: দৈনিক আমাদের সময়

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত