শুক্রবার, মার্চ ১৩, ২০২৬

প্রাচীন রোমানদের উন্মত্ত জীবনধারার ধ্বংসে চিত্র আবিস্কার পম্পেইয়ে

আপডেট:

প্রাচীন রোমানদের উন্মত্ত জীবনধারার একটি অজানা দিক উন্মোচিত হয়েছে পম্পেইয়ে। নতুন আবিষ্কৃত এক বিরল ফ্রেসকোয় (দেয়ালে আঁকা ছবি) প্রকাশ পেল ডায়োনিসাসের মিস্টিরিয়াস বা গোপন পূজার আচার-অনুষ্ঠানের দৃশ্য। বিশেষভাবে, এটি একটি মেগালোগ্রাফি—যেখানে মানুষের বাস্তব আকৃতির সমান আকার চিত্রিত করা হয়। চিত্রকর্মটি ছিল বেশ বড়সড় এক ভোজন কক্ষের দেয়ালে।ফ্রেসকোটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৭৯ খ্রিস্টাব্দে যখন ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়, তখন ফ্রেসকোটি ছিল প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। সেই বিপর্যয়ে পুরো পম্পেই শহর ছাইচাপা পড়ে, মারা যায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ।নতুন আবিষ্কৃত ফ্রেসকো বা দেয়ালচিত্রটি পাওয়া গেছে শহরের কেন্দ্রস্থলের নবম রিজিয়নে। সেখানে আবিষ্কৃত হচ্ছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এতে দেখা যায়, পম্পেইয়ের বিখ্যাত লাল রঙের দেয়াল ও স্তম্ভে চিত্রিত হয়েছে প্রাচীন গ্রিক দেবতা ডায়োনিসাসের উৎসবের দৃশ্য।নারী ও পুরুষ পুরোহিতদের সেই সমাজে বলা হতো ব্যাকান্ট বা মেনাড। তাদের আনন্দে নৃত্যরত অবস্থার চিত্র রয়েছে ফ্রেসকোগুলোয়। পাশে রয়েছেন বংশীবাদক এবং কাঁধে মৃত পশু বহন করা নারী শিকারিরা। এক জায়গায় দেখা যায়, এক শিকারি হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে, তার মাথায় ঝুলছে পশুর নাড়িভুঁড়ি। আরেক দৃশ্যে এক ব্যক্তি অ্যাক্রোব্যাটের মতো শরীর বাঁকিয়ে মদের পাত্র থেকে ঢালছেন প্রসাদী মদ।এই ফ্রেসকোর মাঝখানে ডায়োনিসাসের সঙ্গী সাইলেনাসের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক নারী—যিনি ডায়োনিসাসের গোপন পূজার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এটি মূলত একটি প্রাচীন ধর্মীয় আচার, যেখানে নেশা উদ্রেককারী উপাদান ব্যবহার করে ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জড়তা দূর করা হতো। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা মিস্ট্রি কাল্ট বা উপাসক সম্প্রদায়ের সদস্য হয়ে উঠতেন। এই সম্প্রদায়ের রীতিনীতি বাইরের লোকদের জানানো নিষিদ্ধ ছিল।খ্রিস্টপূর্ব ১৮৬ সালে, রোমান সিনেট ব্যাকানালিয়া উৎসব নিষিদ্ধ করেছিল নৈতিক কারণে। তবে দক্ষিণ ইতালিতে উৎসবটি বহুদিন টিকে ছিল।ফ্রেসকোয় থাকা মানব আকৃতির নিচে দ্বিতীয় সারিতে আঁকা হয়েছে জীবিত ও মৃত প্রাণীদের ছবি। পাশাপাশি রয়েছে সমুদ্রের প্রাণী ও ঝুড়িতে রাখা সামুদ্রিক খাবার।পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুখত্রিগেল বলেন, চিত্রকর্মগুলো ভোজনকক্ষে অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্যই আঁকা হয়েছিল। অনেকটা নিউ ইয়র্কের ইতালীয় রেস্তোরাঁয় মিকেলাঞ্জেলোর ‘ক্রিয়েশন অব অ্যাডামের’ মতো, যাতে ভিন্নধর্মী আবহ তৈরি করা যায়।তিনি আরো বলেন, প্রাচীন যুগে মেনাড বা ব্যাকান্ট ছিলেন এমন নারীরা যারা ঘর, সন্তান ও সমাজের নিয়ম ভেঙে পাহাড়ে শিকারে বের হতেন, নৃত্যে মেতে উঠতেন এবং খেতেন কাঁচা মাংস। তারা ছিলেন একেবারেই বিপরীতধর্মী নারী— যারা ভেনাস দেবীর মতো সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রতীক নন, বরং এক উন্মত্ত স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি।নতুনভাবে নামকরণ করা হয়েছে এই কক্ষকে— ‘হাউস অব থিয়াসাস’, গ্রিক ভাষায় যার অর্থ ডায়োনিসাসের ভক্তদের শোভাযাত্রা। এরইমধ্যে দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। একসঙ্গে ১৫ জন প্রবেশ করতে পারবেন কক্ষটিকে।২০২৪ সালে পম্পেই সাইটটি দেখেছেন ৪০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী। ২০২৫ সাল থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২০ হাজার দর্শনার্থী সাইটটি দেখতে পারবেন।ডায়োনিসাস সম্পর্কিত একটি চিত্রকর্ম ভিলা অব দ্য মিস্টেরিজ-এ খুঁজে পাওয়ার ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর পাওয়া গেল এই নতুন আবিষ্কারের খবর। ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ২ হাজার বছর পরেও প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়ের এক আধার হয়েই রয়ে গেছে পম্পেই।

সূত্র: সিএনএন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত