বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

নাট্যাচার্য ডক্টর সেলিম আল দীন—বাংলাদেশের নাট্যভূমিতে এক গভীর শিকড়ের প্রতিশব্দ

আপডেট:

বিনম্র শ্রদ্ধা ও স্মরণে হে গুরু…

নাট্যাচার্য ডক্টর সেলিম আল দীন—একটি নাম নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্যভূমিতে এক গভীর শিকড়ের প্রতিশব্দ। যিনি মঞ্চকে কেবল আধুনিকতার অনুকরণে নয়, বরং বাংলার মাটি, লোকজ স্মৃতি, আচার-অনুষঙ্গ আর মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন ভাষা দিয়েছেন। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনী জেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্ম নেওয়া এই নাট্যকার ১৪ জানুয়ারি ২০০৮-এ চলে গেলেও, তাঁর নির্মিত নাট্যভুবন আজও আমাদের চিন্তা ও অনুভূতিকে নাড়া দেয়।স্বাধীনতার পর যখন বাংলাদেশের নাটক নিজের পথ খুঁজছিল, তখন সেলিম আল দীন সেই অনুসন্ধানকে নিয়ে গেলেন শেকড়ে—লোকসংস্কৃতি, পালাগান, কীর্তন, যাত্রা, গ্রামবাংলার বয়ানভঙ্গি তাঁর নাটকে হয়ে উঠল শক্তিশালী নান্দনিক অস্ত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিকতা মানে শেকড় ছেঁটে ফেলা নয়; বরং শেকড়ের ওপর দাঁড়িয়েই নতুন আকাশের দিকে তাকানো। এই দর্শনেরই মঞ্চরূপ আমরা দেখি ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘চাকা’, ‘যৈবতী কন্যার মন’-এর মতো কালজয়ী নাটকে।ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়া (১৯৭৩) কেবল একটি দলের সদস্য হওয়া নয়, বরং একটি আন্দোলনের অংশ হওয়া। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা-উত্তর নাট্য আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক ও শিল্পী-নেতা। আর ১৯৮৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চায়ও এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন। অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর কাছে নাটক শিখেছে শুধু অভিনয় বা নির্দেশনা নয়—শিখেছে ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নাটকের সম্পর্ক।গবেষণায়ও সেলিম আল দীন অনন্য। ‘বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও বিকাশ’ গ্রন্থটি বাংলা নাট্যগবেষণায় একটি মাইলফলক, যার জন্য তিনি ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে একুশে পদক (২০০৭) এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩) তাঁর বহুমাত্রিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হয়ে আসে। চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন ‘কিত্তনখোলা’ ও ‘চাকা’র চলচ্চিত্রায়ন তারই প্রমাণ।সেলিম আল দীন আমাদের শিখিয়েছেন—নাটক কেবল বিনোদন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভাষা। তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমরা আজও বাংলার নদী, চর, মানুষ আর ইতিহাসের সঙ্গে নতুন করে কথা বলি। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর নাটক আমাদের মঞ্চে, পাঠে আর মননে চিরজীবিত।

বিজ্ঞাপন

-তানভীর আলাদিন
প্রধান সমন্বয়কারী, ফেনী থিয়েটার

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত