সোমবার, এপ্রিল ১৫, ২০২৪

পিছুটান

আপডেট:

মাজেদার বয়স ১৮ কিংবা ১৯-এর মধ্যে হবে। বাবা ময়েন উদ্দিন লাঠি ধরে ধরে হাঁটার বয়সে পা দিয়েছে। পঁচাশি তো হবেই। সন্তান হয় না হয় না করে শেষ বয়সে এই মাজেদা সংসারে আসে। মা তাকে কোনোমতে দুধপান করাতে পেরেছে। তারপর স্তন ক্যানসারে তার মা ছকিনা বিবিও পরলোক গমন করেন। ছকিনার মৃত্যুর সময় মাজেদার বয়স হয়েছিল তিন বছর। ময়েন উদ্দিন এখন সংসারে কলাগাছের মতো। এমনি দাঁড়িয়ে আছেন মাত্র। কুঁজো হয়ে লাঠি ধরে হাঁটেন। কোনোমতে খাবারের সময় হলে একটু খান। গোসল-টোসল ঠিকঠাকমতো করতে পারেন না। মাজেদা তির তির করে বড় হয়ে উঠল। লেখাপড়া পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত করতে পেরেছে। এরপর টাকা- পয়সার অভাবে স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। একবেলা খেলে আরেক বেলার জন্য চিন্তা করতে হয়। তাই মাজেদা চিন্তা করল তাকে একটা কিছু করতেই হবে। অন্তত বৃদ্ধ বাবার মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে পারলেই হলো। পাশেই বড় চাতাল। বড় রাইসমিল। যেখানে প্রতিদিন শত শত মণ ধান ভাঙা হয়। মাজেদা প্রায়ই দেখেন চাতালে আট-দশজন মহিলা প্রতিদিন কাজ করে। পুরুষও আছে অনেক।
সেদিন শনিবার। মাজেদা সকালেই চাতালে গেল। চাতালের একপাশে অফিস। মাজেদা একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, মালিক কোথায় থাকেন। অফিসের দিকে ইশারা করে মহিলা জবাব দিলেন, ‘ওই যে, ওই দিকে যান। ওহানেই উনি আছেন।’ মাজেদা সাহস করে মালিকের অফিসে গিয়ে ঢুকল। মাজেদা বলে, স্যার, একটা কথা কবার চাচিলাম। ‘কি কথা, বলুন।’ মালিক বলে। মাজেদা সাহস করে বলে। হামার মা নাই, বাপটা মরে মরে অবস্থা। সংসারে এখন হামি ছাড়া কেউ নাই। তাই হামাক একটা কাজ দেন।

চাতালের মালিক একটু গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘তা দেবো। তো, বাড়ি কই তোমার?’
—হামার বাড়ি স্যার এহানেই। এই গ্রামেই।
—কার মেয়ে?
—ময়েন উদ্দিনের।
—ও। এর আগে মনে হয় তোমাকে দেখিনি।
—আমি বাড়ির বাইর হই না। কিন্তু এখন।
কথাটা বলে মাজেদার চোখে সামান্য পানি আসল। চাতালের মালিক স্বপন চৌধুরী মানুষ হিসেবে ভালো, তবে ভেতরে ভেতরে চিজ একটা। বললেন, টেনশন করো না। কাল থেকে এসো।
কথাটা বলে মাজেদার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল। মাজেদা লজ্জা পেয়ে সালাম দিয়ে উঠে চলে গেল।
এক মাসের মতো হচ্ছে মাজেদা চাতালে কাজ করে। এখানে যারা কাজ করে সেসব মহিলার থেকে মাজেদা বয়স অল্প। অবিবাহিতা। রূপ লাবণ্যের ছোপ শরীরে বেশ লাগিয়ে আছে। ফর্সা নয়। তবে শ্যামলার চেয়ে আরো একটু উজ্জ¦ল। যেটা মাজেদার জন্যই মানায়। মুখবয়বের একটা আর্ট আছে। গায়ের জামা কাপড় দামি নয়, তবে পরিষ্কার পরিপাটিতে মাজেদা এক ও অদ্বিতীয়। চাতালের মালিক স্বপন চৌধুরী যখনি অফিসে এসে বসেন, তখনি মাজেদাকে ডেকে পাঠায়। মাজেদাও প্রতিদিনের মতো এক গ্লাস পানি হাতে চলে যান অফিসে। আজকেও সেরকম ঘটল। স্বপন সাহেব চাতালে আসলেন। বল্লেন ‘এই কে আছো মাজেকে ডাকো।’ ওখানে আরেক মহিলা কর্মী মাজেদাকে বললো, ওই ছুঁরি, সাহেব তোক ডাকে যা। মাজেদা অফিসে গেল। স্বপন সাহেব বললেন, ‘তোমাকে এই মাহিলাদের টিম লিডার বানাতে চাই। তোমার মত কী?’
মাজেদা বলে, হামি যে নতুন, আর ওরা তো হামাক হিংসা করে খুব। মালিক বলে, কেন হিংসা করে? এই যে, কাউকে না ডেকে হামাক ডাকলেন। ও, এই সমস্যা। ওরা তোমার কিছু করতে পারবে না। আরেকটা সুসংবাদ আছে। কী? এই মাস থেকে তোমার বেতন হবে তিনশ টাকা দিন। অর্থাৎ নয় হাজার টাকা মাস। কথাটা বলে স্বপন সাহেব মাজেদার ডান হাতটা ধরতে চাইলে মাজেদা দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। মাজেদা সব বোঝে। জ্ঞান-বুদ্ধিতে পাকা একটা। মালিক মশাই কী বলতে চায় সেটা মাজেদা ঠিকই বোঝে। আর মহিলারাও তাতে একটু মাইন্ড করে বসে। সেটাও মাজেদা বোঝে। সে কারণেই ওরা হিংসা করে। কিন্তু মাজেদার আর্থিক সাপোর্টটা বড় ব্যাপার এখন। তাই মাজেদা চুপচাপ ভাবছে একাকী। সেদিন সন্ধ্যার আগেই মাজেদার কাজ শেষ হলে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। চাতাল থেকে বাড়ি হাঁটলে ছয়- সাত মিনিটের পথ। মাজেদা সময় কম, তাই জোরেই হাঁটছে। পেছন থেকে এক যুবক ঢন ঢন করে সাইকেলে বেল চাপতে চাপতেই মাজেদার গায়ের সঙ্গে লেগে গেল। ছেলেটি পাশে পড়ে গেল। তাতে ছেলেটির হাত-পা আঘাতে ছিলে গেল। মাজেদা হতভম্ব হয়ে গেল। মাজেদা ছেলেটিকে মাটি থেকে তুলতে চাইলে ছেলেটি বাধা দিয়ে বলল। সাইকেলে বেল দিতেছি শোনেন না? কান কি ঠসা? মাজেদা একবার শুধু সরি বলে চলে গেল।

বিজ্ঞাপন

পরের দিন সকালে মাজেদা তার কর্মস্থলে আসার জন্য সড়ক দিয়ে হাঁটা শুরু করেছে। আবারো ওই ছেলেটি সাইকেল নিয়ে বেল দিচ্ছেন আর হাঁকিয়ে পেডেল মারছেন। মাজেদাকে দেখে চিনতে পেয়ে ছেলেটি সাইকেল থেকে নেমে মাজেদার সঙ্গে হাঁটা শুরু করলো। প্রশ্ন করে, আপনার নাম কী? মাজেদা মুচকি হেসে বলল ‘নাম শুনে কাম কী?’ ছেলেটি তার হাতের ক্ষত দাগ দেখিয়ে বলল, দেখেছেন, কী হচে হামার? মাজেদা নিজেকে অপরাধী মনে করে। তাই একটু সহানুভূতি দেখানো দরকার। একটু ভেবে আস্তে বলল, নাম হামার মাজেদা। মাইনসে মাজে করে কয়।
—নামটাও সুন্দর। আপনিও সুন্দর। রাতে ঘুম হয়নি। বড় জ্বালা করেছে হাতে। মাজেদা লজ্জা পেল। বলে, সরি আর বলেন না। কথাটা বলে মাজেদা সটকে পড়ল চাতালের দিকে। ছেলেটি সাইকেলে চেপে ঢন ঢন করে বেল দিতে দিতে চলে গেল।
চাতালে এসে মাজেদার মনটা কেমন করছে। এদিকে সব মহিলাদের লিডার সে। মাজেদা সবাইকে ধানে পা দিতে বলে এক ঢোক পানি মুখে দিল। রোদ পড়েছে খুব। অনেক ধান। একশ মণের বেশিই হবে। বিকালে আবার ধান মেশিনে ঢুকবে। তাই মাজেদা হিসাব করে নেতৃত্ব দিচ্ছে। চাতালের মালিক এসে বলল, এই মাজে, সকালে ভাত খেয়েছো? মাজে বলে হ।
—বুড়ো বাপরে খাওয়াইছো? মাজে ঘাড় নাড়ে। এটুকু খোঁজ নিয়ে স্বপন সাহেব শহরে চলে গেল আর বলল, ‘ভালো করে সকলে কাজ করো’। দুপুরে খেয়ে দেয়ে সবাই বটগাছের ছায়ায় বসে আছে। মাজেদা বয়সে সবার ছোট। তবে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া থাকায় পড়তে ও লিখতে পারে সুরুতহালেই। মাজেদা আরেকজন সহকর্মীকে নিয়ে রাস্তার উত্তরপাশে হাঁটতে যায়। এক মাসের বেশি হয়ে গেল এদিকে আসেনি। মাজেদা ডান দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে গেল সেই ছেলেটি আরেক চাতালে কাজ করছে। ছেলেটিও দেখছে মাজেদাকে। দুজন চোখে চোখ রাখল সামান্যক্ষণের জন্য। অতঃপর মাজেদা তার সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে নিজ চাতালে আসলো। তার সহকর্মী হাজেরা কিছুই টের পেলেন না।

ছেলেটির নাম নয়ন শেখ। ডাক নাম নয়ন। গত দুদিন হলো কেমন যেন আনমনা। মাজেদার প্রতি একটা গোপন টান। কিছুক্ষণ পর নয়ন কাজের ফাঁকে একটু ‘গাও জুড়ায়ে আসি’ বলে সরদারকে সিগন্যাল দিয়ে এ দিকে আসলো। আসার সময় পাশের মুদিদোকান থেকে দশটি চকলেট নিয়ে আসলো। এসে দেখে নয়নের পরিচিত দুজন পুরুষ লেবার এখানে কাজ করে। বললো, নছের ভাই, আপনি এটি কদ্দিন হলে? নাছের উত্তর দেয়, হয়েই তো গেল ছয়-সাত মাস। ‘ও ভালোই তো’ কথাটা বলে নয়ন তার পকেট থেকে চকলেট বের করে সবাইকে একটি করে দিল। কিন্তু মাজেদার এখানে এসে ওকে দিল দুটি। যদিও সব দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। ওর জন্যই আনা। কিন্তু পরিবেশ সেরকম নয়। তবু মাজেদা মনে মনে খুব খুশি হলো। মাজেদা চকলেট নিয়ে ওর দিকে চেয়ে একবার ছোট্ট করে মুচকি হাসল। নয়ন এই চোরা হাসি নিয়ে যারপরনাই আনন্দে পাশে তার নিজ চাতালে চলে গেল। এরই মধ্যে চাতালের মালিক স্বপন চৌধুরী এসে উপস্থিত হলো। এসে মাজেদার খোঁজ আগে। ‘কী খবর মাজে, কাজকর্ম কেমন হচ্ছে?’। মাজে মুচকি হেসে বলে ‘ভালো আজকে তো এখনো রোদের চিকাস বারাইনি। এতগুলো ধান’। স¦পন বলে, ‘খুব শীত পড়েছে’। স্বপন সাহেব এতটুকু বলে অফিসে ঢুকল সঙ্গে মাজেদাকেও আসতে বলল। মাজেদা নিয়মমতো এক গ্লাস পানি নিয়ে অফিসে ঢুকল। স্বপন সাহেব একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চিত্তে বলল, তোমাকে একটা কথা বলব।
—কী কথা।
স্বপন সাহেব ইতস্তত স্বরে আস্তে বলল, ইয়ে মানে। তোমাকে বি-বিয়ে করতে চাই। তুমি কি তাতে রাজি?
মাজেদার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। লজ্জা এবং ভয়। মাজেদা চিন্তায় হিম হয়ে গেল। স্বরটা এলোমেলো হয়ে গেল তার। ভাঙা গলায় বলে, আপনার না বউ ছোল আছে? স্বপন ইতস্তত করে বলে, ধুত্তুরি। না থাকে। তোমার জন্য আলাদা বাড়ি ঘর করে দেবো। মাজেদা এতটুকু বলে মুখে চাদর গুঁজে চলে যেতে লাগলে স্বপন সাহেব তার হাত ধরে ফেলে। হাত ধরে তার চেয়ারের পাশে বসাল এবং কপালে ছোট্ট করে কিস দিল। মাজেদা নির্বিকার। এখানে তার করার কিছুই নেই। গরিবের খুব বেশি ইচ্ছা থাকতে নেই। কোটিপতি-লাখপতিদের এগুলো ব্যাপার নয়। তারা জানেই গরিবরা পেটের দায়ে মুখে কুলুপ আঁটে। মাজেদা ভয়ে লাল হয়ে গেল। বলল, হামাক যেতে দিন। মানসে দেখলে ক্যালেঙ্কারি করবি।
স্বপন বলল, ওসব চিন্তা করো না। আমি তো বিয়েই করব। মাজেদা কান্না স্বরে বলল। হামি আজ কাজ করমো না। হামাক ছুটি দিন, বাড়ি যামো। স্বপন বলে, ঠিকাছে যাও। কাল সকালে এসো। আর সন্ধ্যায় তোমার বাড়িতে যেতে পারি। মাজে বলে, না বাড়িতে যাবেন না।
এই কথা বলে মাজেদা কোথাও না থেমে সোজা বাড়িতে চলে গেল। চাতালের সবাই তার যাওয়া দেখল। ‘ইদানীং স্যারের সঙ্গে খুব ভাব দেখতাছি’, হাজেরা মাজের যাওয়া দেখে মন্তব্য করল। মেরিনা বলল, ‘কী যে হচ্ছে আল্লা মাবুত জানে’। মাজেদা বাড়ি গিয়ে বৃদ্ধ বাবার সঙ্গেও কথা না বলে গায়ে লেপ দিয়ে শুয়ে পড়ল। শরীরের ভেতর ভয়, টেনশন। জীবনে এই প্রথম একজন তাকে ছুঁয়েছে। ছোঁয়ার অনুভূতিটা উপলব্ধি করছে। তারা বড়লোক, কোটিপতি। বউ আছে, ছোল আছে। এদিকে নয়ন তার মন কেড়ে বসে আছে গোপনে। কিন্তু তার পক্ষে স্বপনকে বিয়ে করার যুক্তিও অনেক। গরিবের জন্য সতীন বড় বিষয় নয়। বিষয় তার ভবিষ্যৎ অঢেল সম্পত্তি। তাই মাজেদা হাজারো কথা ভাবছে আর ভাবছে। চোখে ঘুম নেই। সন্ধ্যার সময় স্বপন সাহেব মোটরসাইকেল নিয়ে হু হু করে মাজেদার বাড়িতে এসে হাজির। মাজেদা নিষেধ করেছিল। তবু আসলো। দরজায় এসে ডাকে, মাজে কই তুমি? মাজেদা ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। তাকে বসার জন্য ভাঙা চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বলল।
—হামি না আপনারে নিষেধ করছিনু।
স্বপন সাহেব বসতে বসতে বললো, ‘একটা জরুরি কথা’।
—কী আবার জরুরি কথা?
—শোনো, সময় নেই। আগামী কালকেই বিয়ে এবং রেজিস্ট্রি। মালিক বলল। মাজেদা হতভম্ব হয়। ‘কী কন আপনি? হামার বাপরে ছাড়া হামি। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে চাতালের মালিক বলে। সমস্যা নেই, ওনাকে আমি বলছি। এই বলে স্বপন সাহেব ঘরের ভেতর গিয়ে মাজেদার বৃদ্ধ বাবাকে বিয়ের কথা জানাল। তিনি ঠিকমতো শুনতে পান না। তবু যতটুকু বুঝলেন হাত নেড়ে সম্মতি জানালেন।
এবার মাজেদার হাত ধরে স্বপন সাহেব বলল। ‘কালকে তুমি বউ হচ্চো তো। তোমার আর কাজ করা লাগবে না। তোমার এই কুঁড়ে বাড়িতেই বিয়ে হবে’। স্বপন সাহেব এই বলে চলে গেল। তখন সন্ধ্যা পার পার। মাজেদা রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াল। একটা গাছের আড়ালে। কিছুক্ষণের মধ্যে নয়ন সাইকেলের ঢন ঢন বেল দিতে দিতে আসলো। মাজেদা তাকে সাইকেল থেকে নামতে বলবে। কিন্তু কী যেন বাধা দিচ্ছে। আর বলতে পারল না। গাছের আড়ালে হওয়ায় নয়ন তাকে দেখতে পায়নি। মাজেদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়িতে ফিরে আসলো। চোখের ধারে সামান্য পানি আসলেও সেটা অগোচরে মুছে ফেলল। নয়নকে মনে প্রাণে ভালোবেসে ফেলেছে। নয়ন তার মতোই অন্য এক চাতালে কাজ করে। নয়নই বরং তার জন্য উপযুক্ত বর। কিন্তু নিজের চাতালের মালিককে কীভাবে এড়িয়ে যাবে। মানুষে তাকে লুচ্চা বলে ডাকে। সেটিও মাজেদার জানা। কিন্তু না বলার জো নেই যে। না বললেও জোর করে বিয়ে করতে চাবে। তখন আরো বেশি বিপদ।
পরের দিন বিকাল হতে না হতেই স্বপন সাহেব মাইক্রোবাসে নিয়ে উপস্থিত। সঙ্গে লোক বেশি নয়। এই দশ-বারো জন। এক মাইক্রোবাসে যা ধরে। সন্ধ্যার আগেই বিয়ের কাজ শেষ হলো। এক লাখ টাকা মোহরানা। নগদ একভরি গহনা। মাজেদা চোখ মুছতে মুছতে মাইক্রোবাসে উঠলো। একাই উঠে বসে পড়ল স্বপন সাহেবের পাশের সিটে। জানালাটা খুলে রাখল, যদি যাওয়ার পথে নয়নকে দেখতে পায় এই ভেবে। কিছুক্ষণের মধ্যই বর-কনে বিদায়- আদায় নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। গ্রাম থেকে চাতাল পর্যন্ত মাটির রাস্তা। তাই আস্তে আস্তে গাড়ি চলতে লাগল। তৎক্ষণাৎ নয়নও সাইকেল নিয়ে গাড়ির সামনে। কিন্তু নয়নের সাইকেলটা পাংচার হয়ে যাওয়ায় টানতে পারল না। সাইকেল থেকে নামতে হলো। এদিকে মাইক্রোবাস সাইড দেওয়ার জন্য বারবার হর্ন দিয়ে যাচ্ছে। মাজেদা যে পাশে বসে আছে নয়ন ঠিক ওই পাশ দিয়েই ক্রস হয়ে গেল। নয়নকে দেখে মাজেদার মনের ভেতর পৃথিবী সমান কান্না নেমে আসলো। মাজেদা ঘুঙুরের ভেতর খুব কাঁদছে। সাইকেলের চাকায় হাওয়া না থাকায় নয়ন হেঁটে হেঁটে কাঁচা রাস্তার এক পাশ দিয়ে যাচ্ছে। সামনে পরিচিত রুস্তুমের সঙ্গে দেখা। ক্যারে রুস্তম, কার বিয়ে হলোরে? নয়ন বলল।
—ক্যা জানিসনে? ওই চাতালের মালিক স্বপন চদরী মাজে’ক বিয়া কইরা নিয়া গেল। লুচ্চাটা এই সহজ-সরল মাইডারেও জীবন নিয়া ছিনিমিনি খেলব। নয়ন থমকে দাঁড়াল। ভাঙা গলায় বলল ‘কী কও রুস্তম ভাই। মাজে’র বিয়া হ’লো?’ রুস্তমের কী যেন তাড়া আছে তাই চলে গেল। নয়ন ওখানে সাইকেল রেখে অনেকক্ষণ বসে মাটিতে কী কী সব আঁকছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। চোখের পানিতে মাফলারটা ভিজে গেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত