নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘সাবেক আইজিপি বা র্যাবপ্রধান হিসেবে বেনজীর আহমেদ যে অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন, অনাচার করেছেন এবং মানুষকে জিম্মি করে বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জিম্মি করে সার্বিকভাবে যেটা করেছেন, সেটা তিনি এককভাবে করেছেন, তা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এখানে মূলহোতা হিসেবে তাকে যেমন জবাবদিহি করতে হবে, এটা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং একইভাবে যারা এই যোগসাজশে জড়িত এবং তাকে সুরক্ষা দিয়েছেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার
তিনি বলেন, ‘বেনজীরের সঙ্গে যারা যোগসাজশ করেছেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় না আনলে এই ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো প্রতিকার হবে না। রাষ্ট্রকে এই বার্তা দিতে হবে যে, যে কোনো অবস্থান থেকেই অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নথি অনুযায়ী, বেনজীর ও তার পরিবার ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ২০৪ দশমিক ৫ একর জমির মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের প্রধান থাকার সময়ে কিনেছেন ১১২ একর জমি। ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও কক্সবাজারে তার এবং তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের মালিকানাধীন জমির সন্ধান পেয়েছেন দুদকের তদন্তকারীরা। ঢাকার গুলশানে রয়েছে অভিজাত চার ফ্ল্যাট আর গোপালগঞ্জে ন্যাচারাল পার্ক। অবশ্য পুলিশ সূত্রের খবর, বেনজীর অন্যের নামেও নানা সম্পদের মালিক হয়েছেন, নানা কোম্পানিতে রয়েছে মালিকানা শেয়ার। বিদেশে রয়েছে নানা সম্পদ।
কিন্তু তিনি কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন? পুলিশ সূত্রের খবর, বেনজীরের বড় আয়ের উৎস ছিল পুলিশের কেনাকাটা। তিনি ডিএমপি কমিশনার থাকাকালে ডিএমপি অফিস থেকেই কেনাকাটা করাতেন। এই কেনাকাটায় লজিস্টিক বিভাগে নির্দিষ্ট উপকমিশনার থাকলেও তিনি নিজস্ব কর্মকর্তা দিয়ে শুধু স্বাক্ষর নিয়ে কেনাকাটা করতেন। কিন্তু বেনজীর যখন আইজিপি পদে যোগ দেন, তখন এই কেনাকাটাকে তিনি কেন্দ্রীয়করণ করেন। অর্থাৎ সারা দেশে পুলিশের যত ধরনের কেনাকাটা আছে, তা পুলিশ সদর দপ্তর ক্রয় করার নিয়ম করেন তিনি। এরপর নিজের পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান থেকে কেনাকাটা করা হতো।
পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশের কাগজ, কলম, পোশাক, অস্ত্র-গুলি, লাঠি-হ্যালমেট, গাড়িসহ এই ধরনের কেনাকাটায় পুলিশ বাহিনীতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় বছরে। এসব কেনাকাটায় যেগুলোতে টেন্ডার দরকার হতো, সেগুলোতে লোক দেখানো টেন্ডার হলেও মূলত বেনজীর সিন্ডিকেট কেনাকাটার দায়িত্ব পেত। এ থেকে তিনি বড় অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিতেন। এর বাইরে পুলিশ বাহিনীতে শত শত কোটি টাকার সোর্স মানি রয়েছে। এই টাকার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব না হওয়ায় বেনজীর বড় অঙ্ক নিজের কাছে রেখে দিতেন। তার আমলে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ইউনিটে প্রয়োজনীয় সোর্স মানি দেওয়া হলেও বেশিরভাগ ইউনিটে নামমাত্র সোর্স মানি সরবরাহ করতেন তিনি।ঢাকা মহানগর পুলিশে দায়িত্ব পালন করছেন—এমন একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, বেনজীরের আমলে কেনা কলম থেকে শুরু করে কোনো ইক্যুইপমেন্ট তারা ব্যবহার করতে পারতেন না। কলমের কালি বেরিয়ে পোশাক নষ্ট হওয়ার অবস্থায় চলে গিয়েছিল ওই সময়ে। কাপড়ের মান খারাপ হওয়ায় কনস্টেবলরাও ইউনিফর্ম পরতেন কষ্ট করে।
ওই কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের রেশন আর পরিবহনের জ্বালানি ক্রয় ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। এসব খাতেও বেনজীরের ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কেউ দায়িত্ব পেতেন না। তার লোকজন কমিশন পৌঁছে দিতেন তাকে।
সূত্র বলছে, বেনজীরের অবৈধ আয়ের বড় উৎস ছিল পুলিশের আবাসনের জমি কেনা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ স্থাপনা নির্মাণ। পুলিশ আবাসনের জমি ক্রয়ের সময়ে তিনি প্রভাব বিস্তার আবাসন কোম্পানিকে নামমাত্র টাকা দেন। কিন্তু পুলিশের কাছ থেকে বাজারমূল্য পরিশোধ দেখান। এজন্য তার নিজস্ব বলয়ের কমিটি কাজ করেছে। এ ছাড়া বেনজীরের আমলে দেশের যেখানেই পুলিশ ব্যারাক, থানা ভবন, পুলিশ লাইন্সসহ পুলিশের স্থাপনা হয়েছে, এসব খাত থেকেও বড় অঙ্কের কমিশন হাতিয়েছেন তিনি। এর বাইরে বিভিন্ন প্রভাবশালীকে অনৈতিক সুযোগ দিয়ে টাকা কামিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন পুলিশ সদস্যদেরই।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে বেনজীর খুব একটা সুযোগ নিতেন না। তবে নিজের অনুগতদের সুবিধাজনক ইউনিট ও পদে পদায়ন করে তাদের মাধ্যমে পরে নানা সুযোগ নিতেন তিনি। যারা বেনজীরের কাছ থেকে বদলি-পদোন্নতির মতো সুযোগ নিয়েছেন, তারা এখন বেশ আতঙ্কে। একসময়ে হাঁকডাক দেওয়া প্রভাবশালী ওই কর্মকর্তারা এখন চুপচাপ অফিস করছেন। অনেকে ভোল পাল্টে তার বিরুদ্ধে নানা সমালোচনাও করছেন। তবে পুলিশের ভেতর থেকেই এদের চিহ্নিত করা উচিত বলেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

