শেখ হাসিনার দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর আলোচনায় এসেছে তার নির্যাতনের বন্দিশালা ‘আয়নাঘর। শেখ হাসিনার রোষানলে পড়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুমের শিকার রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের গোয়েন্দা সংস্থার ‘গোপন বন্দিশালা”য় রাখা হয়। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা আয়নাঘর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মিডিয়ায় ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন।
গত মঙ্গলবার গোপন বন্দীশালা আয়নাঘর থেকে মুক্ত হয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বরখাস্ত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। গত সোমবার মধ্যরাতে তাঁদের রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার সকালে তারা পরিবারের কাছে ফিরেছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘ ৮ বছর পর তারা মুক্ত হন। এদিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কথিত আয়নাঘর থেকে মুক্তি পেয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতা মাইকেল চাকমা। গতকাল ইউপিডিএফ এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হওয়া ইউপিডিএফের সংগঠক মাইকেল চাকমা দীর্ঘ পাঁচ বছর তিন মাস পর অবরুদ্ধদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। গত মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের একটি স্থানে তাঁকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক অংগ্য মারমা গতকাল বলেন, মাইকেল চাকমা ‘আয়নাঘর’ থেকে মুক্তি পেয়েছেন। নিরাপত্তার জন্য তাঁকে বিশেষ স্থানে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, সারাদেশে ডিজিএফআই’র ২৩টি গোপন আটক কেন্দ্র রয়েছে। যার মধ্যে কয়েকটি রয়েছে ঢাকায়। এদিকে শুধু ডিজিএফআই এই নয়, র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব) এর ১৫টি ব্যাটালিয়ানের প্রতিটিতেই রয়েছে এভাবে গোপন বন্দীশালা বা আয়নাঘর। র্যাবের হেড কোয়ার্টারসহ ঢাকায় ৫টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। এছাড়া বাকী ১০টি রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে অবস্থিত। ২০২৪ সালের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার বছর, ২০০৯ সাল থেকে তার পতন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬০০টিরও বেশি গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।এসব বন্দীশালায় বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের দীর্ঘদিন বন্দী রেখে নির্যাতন করা হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে র্যাব নাশকতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অভিযান ব্লক রেইড বা জঙ্গী অভিযান পরিচালনা করতো তখন বন্দীশালা বা আয়নাঘর থেকে বন্দীদের নিয়ে সাজাতেন এরা নাশকতা বা সহিংসতা করেছে।
এছাড়া এদের জঙ্গী হামলা বা নাশকতা করার টার্গেট ছিল। আবার অনেককে এখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে ক্রসফায়ার সাজানো হতো। বিভিন্ন সময়ে র্যাবে দায়িত্ব পালন করা একাধিক কর্মকর্তা র্যাবের এই আয়নঘরের তথ্য জানিয়েছেন। তাদের মতে, র্যাবের এই আয়না ঘরেও নিরাপরাধ ও গুমের শিকার অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন।
শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর সেই আয়নাঘরের সামনে গত মঙ্গলবার সকালে বিক্ষোভ করেছেন গুম হওয়াদের স্বজনেরা। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কচুক্ষেতে ডিজিএফআই সদর দপ্তরের সামনে ‘মায়ের ডাক’-এর ব্যানারে অন্তত ২৩ গুম হওয়া ব্যক্তির অর্ধশত স্বজন মানববন্ধন করেন। এ সময় তাদের হাতে গুম হওয়া মানুষের ছবি ছিল। তারা ডিজিএফআই সদরদপ্তরে প্রবেশ করে স্বজনদের দেখতে চান, তবে তাঁদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আয়নাঘর থেকে মুক্তি পাওয়া একজন জানিয়েছেন, এখনো অনেক মানুষ আয়নাঘরে আটক রয়েছেন।
২০১৫সালের ১৬ ই নভেম্বর বাড্ডায় নিখোঁজ হওয়া নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র মেহেদী হাসান বাসা থেকে তার মা থেকে ২০০ টাকা নেওয়ার পর বেরিয়ে গিয়েছিলো যে এখনও পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বাবা জসিম উদ্দিন তার ছেলের খোঁজে আয়না ঘরের সামনের অপেক্ষামান। হয়তো তার ছেলেও বের হবে এই আশা নিয়ে। এরকম অনেক পরিবারের সাথে আমাদের প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন। গুম হওয়া ফেনীর বিএনপি নেতা শাহজাহান ভূঁঞার পরিবারের সাথে কথা বললে তার স্ত্রী জানান যে, দীর্ঘ ৪ মাস তার স্বামীর কোনো খোঁজখবর পাচ্ছে না। তার স্বামী বেচে আছে নাকি মরে গেছে তা ও জানে না। এ ঘটনার জন্য তিনি তার দেবরকে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন। কেননা, তার ছেলে সারওয়ার জাহানকেও দেড় বছর আগে তার চাচার সহযোগিতায় পুলিশ ও আওয়ামিলীগের সন্ত্রাসীরা ৫ দিন গুম করে নির্যাতন করেছিলো। যদিও পরবর্তীতে মুক্তিপথ দিলেও না ছেড়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাবাসে পাঠায়। পরবর্তীতে জীবম হুমকির ভয়ে প্রায় একবছর আগে তার ছেলে দেশ ত্যাগ করেছেন।
শাহিনা আক্তার তার স্বামীর জন্য মেয়ে সহ হাজির আয়নাঘরের সামনে। উল্লেখ্য, ৬ বছর আগে তার স্বামীকে ৬/৭ লোক মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আরেক বোন তার ভাইয়ের খোঁজে হাজির। সাদাপোশাকধারী কিছু লোক ৬ বছর আগে র্যাব পরিচয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে তার ভাইকে নিয়ে যায়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার ভাইকে পায় নাই। ২১/০৯/২০১০ সালে গুম হওয়া মনির হোসেনের খোঁজে তার বড় ভাই আয়না ঘরের সামবে উপস্থিত। তাকেও র্যাব পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী কিছু লোক গুলিস্তান নাট্যমঞ্চের সামনে থেকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে র্যাব- পুলিশের কাছে গেলেও তারা কোনো খোঁজ দিতে পারে নাই।
২০১৬ সালে র্যাব-৫ এর হাতে ঘুম গুম হওয়া ইসমাইল হোসেনের সন্ধানে তার স্বজনরা তারাও আয়নাঘরের সামনে অপেক্ষমান। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের মূল হোতা নূর হোসেনের শেলোকের সাথে ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্বের জেরে রুবেল চৌধুরকে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে র্যাব-১১ এর সিও তারেক সাইদ তার পরিবারের কাছে ২ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরবর্তীতে ১ কোটি টাকা দিলেও তাকে মুক্তি দেয়া হয় নাই। আজকে ১১ বছর ধরে রুবেলের কোনো সন্ধান নেই। তার বড় ভাই আয়নাঘরের সামনে তার ভাইয়ের সন্ধানে উপস্হিত। এরকম শতাধিক পরিবার আজ তাদের স্বজনদের খুজতেছে।
শুধু এটা জানার জন্য যে, তারা বেচে আছে নাকি মেরে ফেলা হয়েছে ।
রিপোর্ট অনুযায়ী আয়নাঘর থেকে খুব কম বন্দি মুক্তি পেয়েছে। তবে কিছু বন্দিকে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি দেওয়া হয়। অনেকেই আবার এনকাউন্টারের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশে এজাতীয় ঘটনার তদন্ত প্রায় হয় নি বললেই চলে। আয়নাঘরে রাখা অনেকেই দিনের পর দিন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মারা যায়। তারপর লাস সরিয়ে দেওয়া হয়। যাদের গ্রেফতার করা হয় তাদের খাতা কলমে কোনো তথ্য রাখা হয় না। আর যারা হাসিনার আস্থাভাজন ছিলেন তারাই আয়নাঘরের দায়িত্ব পেতেন। আয়নাঘরের বন্দিদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদের দেখা করা বা যোগাযোগের কোনও আইন ছিল না।



