শুক্রবার, মার্চ ২৭, ২০২৬

ইউনিয়ন পরিষদ যেন জন্মনিবন্ধন সনদ বেচাকেনার হাট সারাদেশে

আপডেট:

গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জন্মনিবন্ধন সনদ কেনাবেচা । মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় কেনা যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এ সনদ, তাও আবার দেশের যে কোনো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। যত খুশি ততো। টাকা পরিশোধের এক থেকে সাত দিনের মধ্যেই হাতে চলে আসছে জন্মনিবন্ধন সনদ।ইউনিয়ন পরিষদ যেন জন্মনিবন্ধন সনদ বেচাকেনার হাট!গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জন্মনিবন্ধন সনদ কেনাবেচা। মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় কেনা যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এ সনদ, তাও আবার দেশের যে কোনো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। যত খুশি ততো। টাকা পরিশোধের এক থেকে সাত দিনের মধ্যেই হাতে চলে আসছে জন্মনিবন্ধন সনদ।
গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চক্রটি জন্মনিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে আসছে। ছবি: সংগৃহীত
গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চক্রটি জন্মনিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে আসছে। ছবি: সংগৃহীত
আশিকুর রহমান

৯ মিনিটে পড়ুন
অভিযোগ রয়েছে, এ জালিয়াতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত কিছু ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও উদ্যোক্তা। তারা ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে এমন ব্যক্তিদের জন্মসনদ তৈরি করে দিচ্ছে, যাদের জন্ম সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন তো দূরের কথা ওই জেলাতেই নয়।

বিজ্ঞাপন

সময় সংবাদের হাতে জালিয়াতি করে তৈরি করা এমন অন্তত পাঁচজনের জন্মনিবন্ধন সনদ রয়েছে। যা ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র, এমনকি পাসপোর্টও তৈরি করেছেন কেউ কেউ। কারো আবার রয়েছে দুই থেকে তিনটি করে জন্মনিবন্ধন সনদ। তাদেরই একজন রিশাদ মণ্ডল, বাড়ি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ইউনিয়নে।অনুসন্ধানে তার দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিবন্ধন করা একটি, ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে নিবন্ধন করা একটি জন্মনিবন্ধন সনদ পাওয়া গেছে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১ জুলাই দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিবন্ধন করা একটি জন্মনিবন্ধন সনদ রয়েছে রিশাদ মণ্ডলের। ওই জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে তিনি জাতীয় পরিচয় পত্রও তৈরি করেছেন। তবে ওই জন্মনিবন্ধন ও পরিচয়পত্রে তার জন্ম তারিখ ২ জানুয়ারি ২০০৭ রয়েছে। এখন তিনি সৌদি আরব যাবেন, তাই বয়স বাড়িয়ে পাসপোর্ট তৈরি করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স বাড়ানোর জন্য গত ২১ এপ্রিল মানিকদহ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নতুন জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করেছিলেন তিনি, যেখানে জন্ম তারিখ দেন ২ জানুয়ারি ২০০৪। ওই জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে নির্বাচন অফিসে জাতীয় পরিচয়পত্রের বয়স বাড়ানোর আবেদনও করেছিলেন রিশাদ। তবে ওই জন্মনিবন্ধন সনদে ইস্যুর তারিখ ২০২৫ এর পরিবর্তে ২০০১ সাল লিপিবদ্ধ হয়। এছাড়াও জন্ম সনদে স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানার গরমিল হওয়ায় তার আবেদনটি বাতিল করে দেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।
এরপর আবারও জালিয়াতির আশ্রয় নেন রিশাদ মণ্ডল। ২৬ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে জন্ম তারিখ ২ জানুয়ারি ২০০৪ দিয়ে আরও একটি জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করেন তিনি। একইভাবে আবারও জাতীয় পরিচয়পত্রের বয়স বাড়ানোর জন্য নির্বাচন অফিসে আবেদন করেন। তার এবারের আবেদনটিও বাতিল করে দেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।জন্মনিবন্ধনের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী, অনুসন্ধান করতে করতে দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বাহিরচর দৌলতদিয়া সাত্তার মেম্বার পাড়ায় নিজ বাড়িতে পাওয়া গেল রিশাদ মণ্ডলকে। জানালেন, সৌদি আরব যাওয়ার জন্য তিনি একজনের মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন করেছেন। রাজবাড়ী নির্বাচন অফিসে বয়স বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। তবে তা বাতিল করা হয়েছে। যে কারণে তিনি এখন মানিকগঞ্জ নির্বাচন অফিসে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র করতে দিয়েছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে নাকি নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়ে যাবেন তিনি।এতসব জালিয়াতি তিনি নিজেই করছেন, নাকি কারো মাধ্যমে করছেন? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি রিশাদ। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলার সময়ই সেখানে উপস্থিত হন তার বাবা বাবু মণ্ডল। গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলার জন্য রিশাদকে ধমকিয়ে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যান তিনি।অনুসন্ধানে জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবের আলাদা ইউজার আইডি রয়েছে। ওই আইডির পাসওয়ার্ড শুধুমাত্র তারা ছাড়া অন্য কারো জানার কথা নয়। তারা যদি চান তবেই অন্য কেউ জানতে পারবেন তাদের পাসওয়ার্ড। আর তাদের ইউজার আইডিতে কাজ করার ক্ষেত্রেও দ্বি-স্তরের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ ইউজার লগইন করার সময় প্রথমে ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড দিতে হয়। লগইন করতে গেলে তাদের মোবাইলে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) পাঠানো হয়। ওটিপি নম্বর দিয়ে লগইন করে তারপর কাজ করতে হয়। আবার যে কেউ চাইলেই তাদের ইউজার আইডিতে ঢুকে সহজে কাজ করতে পারবে না। কারণ কিছুক্ষণ পরপরই লগ আউট হয়ে যায় তাদের ইউজার আইডি। প্রতিবার লগ আউট হওয়ার লগইন করার সময় মোবাইলে নতুন ওটিপি নম্বর আসে। ওটিপি কোড দিয়ে আবার লগইন করে কাজ করতে হয়।তবে জন্মনিবন্ধন তৈরির অধিকাংশ কাজটিই ইউপি সচিব করে থাকেন। তিনি জন্মনিবন্ধনের জন্য নাগরিকের আবেদনপত্র গ্রহণ করেন। আবেদনকারীর প্রদত্ত তথ্য, যেমন—জন্ম তারিখ, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি যাচাই করেন। প্রয়োজনে জন্মের প্রমাণ চাওয়া হয় (হাসপাতালের সনদ, মিডওয়াইফের রেকর্ড, ওয়ার্ড সদস্যের সুপারিশ ইত্যাদি)। জন্মনিবন্ধন সফটওয়ারে প্রয়োজনীয় তথ্য এন্ট্রি করেন এবং জন্মনিবন্ধনের খসড়া তৈরি করেন। সবশেষ আবেদন যাচাই শেষে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করেন এবং এটি ইউপি চেয়ারম্যানের অনুমোদনের জন্য পাঠান। ইউপি চেয়ারম্যান সচিবের প্রস্তুত করা জন্মনিবন্ধন তথ্য যাচাই করে তাতে অনুমোদন দেন। এটি সাধারণত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘অ্যাপ্রুভ’ করার মাধ্যমে হয়ে থাকে। কখনো কখনো প্রিন্ট করা জন্ম নিবন্ধন সনদে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয় (যদি সনদটি হাতে লেখা বা স্থানীয় ব্যবস্থায় তৈরি হয়)।সারাদেশে এই কাজ হরহামেশাই চলছে। এর কোন প্রতিকারে সরকার কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও অন্যদের যোগাসাযে এই অপকর্ম চলছে। রাজবাড়ী, দৌলতপুর, চাঁদপুরের ইউনিয়নে অনিয়ম হয়েছে তার কপি রয়েছে গণমাধ্যম কর্মী কাছে।
তথ্যসুত্র ঃসময়

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত