স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে শিশু হত্যা, বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা এক অনপনেয় কলঙ্ক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে অবোধ শিশুরা নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাবে, যাদের চোখে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে ওঠার কথা, তারা আজ হিংস্রতার বলি হচ্ছে। সামান্য একটি আইফোনের জন্য খুন হতে হয় ১৩ বছরের প্রীতমকে। কিশোর প্রীতমদের চোখে রক্ত বা কোনো অন্যায় ছিল না, ছিল নতুন কিছু দেখা ও দেখানোর স্বপ্ন। অথচ মাদককারবারি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের গাফিলতি এবং সর্বোপরি বিচারহীনতার সংস্কৃতির বলি হয়ে প্রীতম আজ কেবলই একটি লাশে পরিণত হয়েছে। প্রীতমের বিদায়ে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার চোখের জল আর প্রীতমের মায়ের আহাজারি যেন আজ লাল-সবুজের পতাকায় রক্তবৃষ্টি হয়ে ঝরছে। পুরো দেশ আজ প্রীতমের মায়ের সেই বুকফাটা কান্নায় স্তব্ধ।
আমাদের সমাজ এবং মানুষের মন-মজ্জা আজ অনৈতিক লেনদেন, চরম অস্থিরতা আর দ্রুত ধনী হওয়ার উন্মাদনায় নষ্ট হয়ে গেছে। যার ফলে সামান্য একটি রিকশার জন্য বা তুচ্ছ ঘটনায় মানুষকে খুন করতে কারো বিবেক কাঁপে না। এই চরম সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধের পেছনে দায় কার? বাংলাদেশ সুশীল সমাজ, আমলা, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা কিংবা আইনজীবী—কারো দায় এড়ানোর ন্যূনতম সুযোগ নেই। অপরাধ সংঘটিত হলে হয়তো পুলিশ আসামি গ্রেপ্তার করে, মামলা হয়, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় অথবা শাস্তি পেতে যুগ পার হয়ে যায়। ততদিনে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম নতুন কোনো হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, প্রীতমরা ঢাকা পড়ে যায় অতীতের ধূলিমলিন ফাইলে। আর মায়ের আহাজারিতে ক্রমাগত ভারী হতে থাকে বাংলাদেশের মানচিত্র।
এই মুহূর্তে জাতিকে কঠোর ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাদককারবারি, সন্ত্রাসী ও খুনি যে-ই হোক না কেন—সে যদি ক্ষমতার খুব কাছাকাছি বা নিজের আপন কেউ হয়, তাহলেও তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া যাবে না। বিচারহীনতার এই বিষবৃক্ত উপড়ে ফেলতে না পারলে আর কোনো মায়ের কোল যে খালি হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? কেবল পুলিশি গ্রেপ্তার বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়; প্রয়োজন দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা এবং অপরাধের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করা। প্রীতম চলে গেছে, কিন্তু প্রীতমের মতো আর কাউকে যেন এই অন্যায় ব্যবস্থার বলি হতে না হয়—সেটাই হোক আজকের অঙ্গীকার।
রক্তাত লাল-সবুজ ও বিবেকের দায়—আমরা কি কেবলই প্রীতমদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প লিখব?
আপডেট:

