বৈশ্বিক অর্থনীতি ২০০৮ সালে গুরুতর সংকটের মধ্যে পড়ে, যা সমাজে বড় ধরনের সম্পদ বৈষম্যও তৈরি করে। ওই সময় অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে নেয়া হয় নানামুখী উদ্যোগ। এর মধ্যে কিছু উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে সংকটের আপাত সমাধান দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য বাড়িয়েছে অর্থনীতিতে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে এখন পর্যন্ত সময় পেরিয়েছে দেড় দশকেরও বেশি। এ সময়ের মধ্যে ইউরোপ মহাদেশের কোনো কোনো দেশে সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে ব্যাপক মাত্রায়। আবার এ বৈষম্য বৃদ্ধিতে লাগাম টানতে সক্ষম হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের হিসাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পদের বৈষম্য এখন সবচেয়ে বেশি সুইডেন ও জার্মানিতে। সবচেয়ে কম বেলজিয়ামে। খবর ইউরোনিউজ।দেশে দেশে বৈষম্য পরিমাপের সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয় গিনি সূচক। এক্ষেত্রে সূচক মান যত বেশি, বৈষম্যের পরিমাণও তত বেশি। ইউবিএসের ‘গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৪’-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সাল শেষে ইউরোপে সম্পদ বৈষম্যের গিনি সূচক সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল সুইডেনে (সূচক মান ৭৫)। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল জার্মানি (৬৮)। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে ছিল যথাক্রমে সুইজারল্যান্ড (৬৭) ও অস্ট্রিয়া (৬৫)। আর সূচক মান ৪৬ নিয়ে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল বেলজিয়াম। সবচেয়ে কম বৈষম্য থাকা দেশগুলোর মধ্যে ৫৭ সূচক মান নিয়ে বেলজিয়ামের পরের অবস্থানে ছিল ইতালি ও স্পেন। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) প্রকাশিত ১২টি দেশের তথ্য নিয়ে এ সূচক তৈরি করেছে ইউবিএস।প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৮-২৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপের কিছু অঞ্চলে সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে, আবার কিছু জায়গায় কমেছে। এক্ষেত্রে সাধারণ প্রবণতা হিসেবে দেখা গেছে পূর্ব ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে বৈষম্য বেড়েছে। আর পশ্চিম ইউরোপে এদিক থেকে দেখা গেছে অনেকটাই মিশ্র প্রবণতা ইউরোপের অন্যতম প্রধান দুই অর্থনীতি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। দেশ দুটিতে গিনি সূচকের মান যথাক্রমে ৫৯ ও ৬১, যা ১২টি দেশের গড় ৬২ দশমিক ১-এর নিচে। নরডিক দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্ক (৬২) ও ফিনল্যান্ড (৬৪) গড়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে। নেদারল্যান্ডসের অবস্থানও ৬৪।ইসিবির ২০০৮-২৩ সাল পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ সময়ের মধ্যে ফিনল্যান্ডে সম্পদ বৈষম্য সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। দেড় দশকে দেশটিতে সম্পদ বৈষম্যের সূচক ৫৩ থেকে ২১ শতাংশ বেড়ে ৬৪ হয়েছে। বৈষম্য বৃদ্ধির হারের দিক থেকে এরপর রয়েছে স্পেন। দেশটিতে সূচক মান ৪৭ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৭। ইতালিতেও সম্পদ বৈষম্য উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে সূচক মান ৫০ থেকে ৫৭ হয়েছে। এ সময়ে যুক্তরাজ্যে সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। ফ্রান্সে বেড়েছে ৫ শতাংশ। সুইডেনে তা বৃদ্ধির হার ১ শতাংশ।এ বিষয়ে স্ট্যাটিসটিকস ফিনল্যান্ডের সিনিয়র গবেষক ভেলি-মাত্তি টোরমালেহতো নিজ সংস্থার এক জরিপের বরাত দিয়ে বলেন, ‘ফিনল্যান্ডে সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে। সাধারণভাবে এ বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ পরিবারগুলোর গড় সম্পদে ভৌত সম্পদের পরিবর্তে আর্থিক সম্পদের অংশ বেড়ে যাওয়া।তিনি আরো বলেন, ‘আবাসন সম্পদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন মূল্যের দুর্বলতা, পতন ও আঞ্চলিক বৈষম্য সব মিলিয়ে সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে গৃহস্বত্বের হ্রাস। একই সময়ে আর্থিক সম্পদ বাড়লেও তা ধনী পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ কারণেও বৈষম্য বেড়েছে।ইউবিএসের প্রতিবেদনে উল্লিখিত ১২টি দেশের মধ্যে দেড় দশকে সম্পদের বৈষম্য কমেছে পাঁচটিতে। এ সময় বেলজিয়ামে বৈষম্যের সূচক মান ১১ শতাংশ কমে ৫১ থেকে ৪৬-এ নেমেছে। একই সময়ে গিনি সূচকের মান জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ৫ শতাংশ করে এবং নেদারল্যান্ডসে ৪ শতাংশ কমেছে।ইসিবির তথ্যানুযায়ী, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ইউরোজোনে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল অঞ্চলটির নিট পারিবারিক সম্পদের ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০০৯ সালের একই সময়ে যা ছিল ৫৪ দশমিক ৫। অর্থাৎ ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।প্রসঙ্গত, এখানে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো আর্থিক ও বাস্তব বা ভৌত সম্পদের মোট মূল্য থেকে ঋণ বাদ দিয়ে পাওয়া ফলাফলকে নিট পারিবারিক সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে

