বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

৫ ব্যাংক মিলে হচ্ছে শক্তিশালী একটি সরকারি ইসলামী ব্যাংক

আপডেট:

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক কিছু ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে, স্বতন্ত্রভাবে এগুলোর টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে—দেশের পাঁচটি বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে একটি বৃহৎ, শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামি ব্যাংক গঠন করা হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকারের মূলধন সহায়তা পেলেই সপ্তাহখানেকের মধ্যেই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। এর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচানো, খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত ব্যবস্থাকে সংস্কার করা এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।কোন পাঁচ ব্যাংক একীভূত হবে
একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।
এই পাঁচটি ব্যাংক রূপ নেবে একটি ব্যাংকে। এটি হবে মূলত সরকারি মালিকানা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। নতুন ব্যাংকটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) অর্থায়নে বিশেষায়িত হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি লাইসেন্সে পরিচালিত হবে। একীভূত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সম্পদ, আমানত, দায়ভার এবং কর্মী কাঠামো একত্রে এই নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে আসবে।ভয়াবহ খেলাপি ঋণের চিত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, গত এক বছরে তিনি ১২টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে সম্পদ মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়া এই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যাংকিং খাতের গড় খেলাপি ঋণ হার যেখানে সরকারি হিসাবেই ৯-১০ শতাংশ, সেখানে এই পরিসংখ্যান চরম সংকটের ইঙ্গিত দেয়।বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, দেশের ১২ থেকে ১৩টি ব্যাংক লুটপাটের শিকার হওয়ায় এগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং আমানতকারীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।নতুন ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনও ঋণ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ না হয়, তা তিন মাসের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণে পরিণত হবে। আগের নীতিতে এই সময়সীমা ছিল ছয় মাস থেকে এক বছর।গভর্নর আরও জানান, যেসব ব্যাংকের বোর্ড এবং পরিচালনা ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল, সেসব ব্যাংকের বড় ধরনের কোনও সমস্যা হয়নি। তাই এখন মূল ফোকাস হচ্ছে সুশাসন নিশ্চিত করা। অপরদিকে, যেসব ব্যাংক নিজেরাই আর কার্যকরভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তাদের একীভূতকরণের আওতায় নিয়ে আসা হবে।বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক ও ইউসিবি ইতোমধ্যে তাদের দুর্বল অবস্থান কাটিয়ে উঠে ভালো অবস্থানে এসেছে।
তবে কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে, যেগুলো আর স্বাবলম্বী হতে পারবে না। আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব ব্যাংককে মার্জারের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথমে এগুলোকে একত্র করে কিছু সময় সরকারি ব্যাংকের মতো পরিচালনা করা হবে, পরে পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে আনা হবে। এই পুনর্গঠনের পর দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশ নিতে পারবেন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কিনতে পারবেন।সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
এই একীভূতকরণের মাধ্যমে একটি বৃহৎ সরকারি ইসলামি ব্যাংক তৈরি হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন বাড়বে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরতে পারে। তবে ঝুঁকিও কম নয়—রাজনৈতিক প্রভাব যদি ফের জেঁকে বসে, তদারকি দুর্বল হয় বা সরকারি মূলধন সহায়তা অপচয় হয়, তাহলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেশের ব্যাংকিং খাতকে নতুনভাবে সাজানোর এক বড় সুযোগ। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক তদারকি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনার ওপর। এই শর্তগুলো পূরণ হলে নতুন ইসলামি ব্যাংক শুধু সংকট কাটিয়েই উঠবে না, বরং দেশের আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগ শুরুর দিকে নানা প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নীতিগত অস্থিরতার কারণে ব্যাহত হয়েছিল। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশের জন্য আধুনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা চালানো হলেও সরকার এখন পর্যন্ত ব্যাংক পুনরুদ্ধারের কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়নি।’জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘সরকার যদি অন্তত এক-দুটি বড় সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে সঠিকভাবে পুনর্গঠন করতো, তবে সেটাই হতো একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত।’

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত