মঙ্গলবার, মার্চ ৩১, ২০২৬

উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ব্যবসাবান্ধব অর্থনীততে পিছিয়ে বাংলাদেশ

আপডেট:

কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো ব্যবসাবান্ধব সূচক (Ease of Doing Business) একটি দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, শিল্প এবং ব্যবসার পরিবেশের সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই সূচকের গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য মতে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়, ফলশ্রুতিতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মোট দেশজ উৎপাদন (এউচ) বৃদ্ধি পায়।ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নত হলে- নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব এবং আসন্ন এফবিসিসিআই নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আসন্ন এফবিসিসিআই নির্বাচনে সহ-সভাপতি প্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা ও ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম। এছাড়া ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন।
শীর্ষ এই তিন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা মনে করেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের সামগ্রিক অবস্থা খুব বেশি উন্নত নয়। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যবসা নিবন্ধনে ডিজিটালাইজেশন এবং কিছু কিছু অনুমোদনের সময় কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করে, তথাপি, অবকাঠামো কর প্রক্রিয়া এবং চুক্তি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। তবে অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এখনো আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি। অর্থায়ন প্রাপ্তি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো, কর পরিশোধে হয়রানি এবং আইনগত জটিলতা এখনো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য যে ধরনের পরিবেশ দরকার, তা এখনো সৃষ্টি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো ভালোভাবে ব্যবসা করার উপযোগী নয়। এখন ব্যাংক খাতে যে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ কম। আবার সবার মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার মনোভাব যদি না থাকে, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হবে না। তাই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে আইনশৃঙ্খলা উন্নতি ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ নিয়মনীতি, কাঠামোগত দুর্নীতি কমানো, অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থিক খাতে সহজ মুদ্রানীতি ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ সম্প্রতি জানান, আমরা সবসময়ই ব্যবসার সঙ্গে রাজনীতিকে আলাদা রাখতে চাই। তবে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ দরকার। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশটাও ঠিক থাকে। তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগের জন্য সব সময়ই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ভালো। নির্বাচন দেওয়া এবং এর দিনক্ষণ ঠিক করা সরকারের কাজ। দেশে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ী নেতা সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশে নতুন করে একটি ব্যবসা শুরু করতে চাইলে উদ্যোক্তাকে শুরুতেই নানা রকম জটিলতার মুখে পড়তে হয়। কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, কর শনাক্তকরণ নম্বর (ঞওঘ) এবং ভ্যাট নিবন্ধন এসব কাজের জন্য একাধিক দপ্তরে যেতে হয়। আর প্রতিটি ধাপেই সময়, শ্রম ও খরচের হিসাব বাড়ে।
তাই ব্যবসা-বাণিজ্য সূচকে উন্নতি করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সহজ ও দ্রুত লাইসেন্স প্রাপ্তি : একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে লাইসেন্স বা অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই লাইসেন্স ও অন্যান্য সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ এবং দ্রুত করা প্রয়োজন। এর জন্য অনলাইন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, কর ব্যবস্থা সহজীকরণ, নির্মাণ অনুমতি ও সম্পত্তি নিবন্ধন সহজ করা, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইত্যাদি সহজ হতে হবে।তিনি জানান, জটিল কর আইন এবং উচ্চ কর হার ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই কর ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়ন বিশেষ করে উন্নত সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্দর, সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি, দ্রুত সংযোগ স্থাপন, পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দ্রুত করা, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা, দেউলিয়া আইন সংস্কার এবং অন্যান্য অবকাঠামো ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করে এই ধরনের অবকাঠামো থাকলে পণ্য পরিবহন সহজ হয় এবং খরচ কমে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই সূচকগুলোতে উন্নতি করা খুবই জরুরি। সরকার এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজ করা। তবে আরও অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। বিশেষ করে, ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাগুলোর মান উন্নয়ন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো খুবই প্রয়োজন।সাকিফ শামীম বলেন, আসন্ন এফবিসিসিআই নির্বাচনে ভোটারদের রায়ে তিনি নির্বাচিত হতে পারলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সবচেয়ে বেশি নজর দেবেন। দেশের সকল চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের জন্য এফবিসিসিআইতে একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা হবে। এর ফলে কোনো অ্যাসোসিয়েশন বা চেম্বারের কি সমস্যা কিংবা খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী- উদ্যোক্তাদের কি ধরনের সেবা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা সহজতর হবে এবং চাহিদা অনুযায়ী তা দ্রুত সমাধান করার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে। এ সকল সংস্কার করার জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।তিনি বলেন, বেসরকারি খাত যত বেশি শক্তিশালী হবে সরকারের রাজস্ব বা আয় ততই বৃদ্ধি পাবে। এজন্য এফবিসিসিআই-কে নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশন ও জেলা চেম্বারগুলোর উন্নয়নে প্রতিবছর বাজেট ঘোষণা করতে হবে। তিনি বলেন, সকল বাণিজ্য সংগঠনকে কার্যকর করতে হলে জাতীয় বাজেট থেকে এফবিসিসিআইয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া অত্যাবশ্যক। এটা সরকারের কাছে আমরা প্রস্তাব করব।
সাকিফ শামীম বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) জোর দেওয়া, ব্যাংক সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা এবং এক্ষেত্রে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা তিন মাসের জায়গায় ছয় মাস কিংবা এক বছর করা, ডিভিসি অডিট রিপোর্ট প্রদানে বাণিজ্য সংগঠনকে সময় দেওয়া এবং কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, ভ্যাটের হার সাড়ে ৭ ভাগ থেকে নামিয়ে ৫ শতাংশ করার মতো উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়েছে।এখনো কর ও ভ্যাট পরিশোধে হয়রানি রয়ে গেছে। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া এখনো বেশ জটিল। এছাড়া আইন-কানুনের তথ্যপ্রাপ্তি, অবকাঠামো সুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উন্নতি করার অবকাশ রয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনতে বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা ও অর্থনেতিক সক্ষমতা করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত