বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দক্ষ প্রশাসন–এই তিনটি ছাড়া অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় : পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

আপডেট:

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সংস্কার পদক্ষেপে সামষ্টিক অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদিও ঝুঁকি ও ভঙ্গুরতা এখনও রয়ে গেছে। এসব ঝুকি ও ভঙ্গুরতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। জ্বালানির সমস্যা হবে আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দক্ষ প্রশাসন ছাড়া অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
গতকাল বুধবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ভবনে ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ক এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অন্যদের বক্তব্য দেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল মোমেন প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার মালা। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। পরিকল্পনা উপদেষ্টা অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর দাবির পক্ষে সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ হলেও চলতি অর্থবছরে তা ৫ শতাংশের কাছাকাছি যেতে পারে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমার বদলে সামান্য হলেও বেড়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির দুরবস্থার মধ্যেও রপ্তানি ভালো। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে।মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে এটি ১১ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় ৮ শতাংশে এসেছে। আরও কমতে সময় লাগবে। তার ব্যাখ্যা, মূল্যস্ফীতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মজুরিও বেড়েছে। ফলে অর্থনীতি একটি নতুন স্তরে চলে গেছে। আগের দামে ফেরা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় দামের প্রত্যাশা তৈরি হয়। নীতি সুদহার প্রসঙ্গে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের ধাঁচে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখেছে এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত তা বজায় রাখার কথা বলছে। এই নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলোর নিজস্ব কোনো জাদুকরী তাৎপর্য নেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চলতি মূলধনের সংকট। উচ্চ সুদের ব্যাংকিং কাঠামোর কারণে এসএমই উদ্যোক্তারা কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন না। ফলে এখানে মুদ্রানীতি ও সুদনীতির মধ্যে সমন্বয়ের সময় এসেছে।উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এসেছি, তার একটি বড় মূল্য দিতে হয়েছে। এই মূল্যটি দৃশ্যমান নয়। আমি একে বলি- অর্থনীতি স্থিতীকরণের অদৃশ্য ব্যয়। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার এবং ব্যাংকিং খাত ধসের মুখে পড়ায় মূলধন জোগানে বাংলাদেশ ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকা ছাপাতে হয়েছে। এর ফলে সুদের হার উচ্চ রাখতে হচ্ছে এবং ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে, যা সরাসরি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিগত সরকারের সময় অর্থ পাচারের পরোক্ষ প্রভাবকে এই ক্ষতির মূল উৎস বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, যেসব শিল্পমালিক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তাদের ফেলে যাওয়া শিল্পে ৩০-৪০ হাজার শ্রমিকের কয়েক মাসের বেতন দিতে হয়েছে উৎপাদন ছাড়াই। বিদেশে বকেয়া জ্বালানি বিল পরিশোধে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতেও হয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এটিও টাকা ছাপিয়েই করতে হয়েছে। এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদি নয়; এটি কয়েক বছর ধরে চলবে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমরা স্থিতিশীলতার দিকে কিছুটা এগিয়েছি, কিন্তু চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি। মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দক্ষ প্রশাসন–এই তিনটি ছাড়া অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।’ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ঋণনির্ভর ব্যয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কার্যত রাজস্ব দিয়ে শুধু পরিচালন ব্যয় চালাচ্ছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন ব্যয় হচ্ছে ঋণ করে–এটি ঝুঁকিপূর্ণ। ঋণ দিয়ে সামাজিক খাত চালালে শেষ পর্যন্ত শুধু সুদ পরিশোধেই আটকে যেতে হবে।’তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে বড় বড় দুর্নীতি কমেছে। অন্য দুর্নীতি আছে। মামলা বাণিজ্য আছে, বদলি বাণিজ্য আছে। কলেজে একটি বদলি করতে ৮ লাখ টাকা লাগে। দুর্নীতি, অপচয় ও প্রকল্প ব্যয়ের লাগাম না টানলে কিছুই সম্ভব নয়।’ উপদেষ্টা বলেন, গত সরকারের সময়ে আপাতদৃষ্টিতে অবকাঠামো হচ্ছিল, অর্থনীতি চলছিল। ভেতরে ভেতরে ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল, বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছিল, আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। এই অবস্থায় গণঅভ্যুত্থান না হলে একসময় বড় ধরনের ধস অনিবার্য ছিল। তবে স্থিতিশীলতার দিকে কিছুটা এগিয়েছে অর্থনীতি, কিন্তু চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি। মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দক্ষ প্রশাসন–এই তিনটি ছাড়া অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে কী সংস্কার হয়েছে? মেশিনারি বা কাঁচামাল আমদানি করেন, ডিক্লারেশন দেওয়ার পর ট্যাক্স পরিশোধ করলেই এক দিনের মধ্যে পণ্য খালাস হওয়ার কথা। বাস্তবে কী হয়? কাস্টমস বুঝতে পারে না কী জিনিস–ফাইল পাঠানো হয় বুয়েটে, রিপোর্ট আসতে এক মাস, তারপর ক্লিয়ারেন্স। এই হয়রানি সম্মিলিত ব্যর্থতা। জমির মিউটেশন করতে গেলে ডিসি অফিসে কী ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়, তা আমরা সবাই জানি।’তিনি বলেন, এখন নতুন নামে আরও একটি চাঁদাবাজি যুক্ত হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে এলআর ফান্ড। এই টাকা কোথায় যায়? কীভাবে ব্যবহার হয়? কেউ জানে না। এই সব কারণে আজ ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কাস্টমসের হয়রানি বন্ধ হলে দেশের রপ্তানি কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন ডলার বাড়ানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত