খাজা মাঈন উদ্দিন
সাংবাদিক
একটি হতাশামূলক উক্তি– ‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়’ সামাজিক মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছু মিডিয়াব্যক্তিত্ব সেই বাক্য বিনা প্রশ্নে এমনভাবে প্রতিধ্বনিত করছেন, যেন অন্তত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটিই চিরন্তন সত্য।কথাটি মূলত সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের। সম্প্রতি মেঘনা নদীতে তাঁর লাশ ভেসে ওঠে। তার আগে একটি সংবাদমাধ্যম বিভুরঞ্জনের ই-মেইল থেকে অনেকটা সুইসাইড নোটের মতো একটি ‘খোলা চিঠি’ পায় ও তাঁর লাশ পাওয়ার আগেই প্রকাশ করে। সেই চিঠিতে ব
একটি হতাশামূলক উক্তি– ‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়’ সামাজিক মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছু মিডিয়াব্যক্তিত্ব সেই বাক্য বিনা প্রশ্নে এমনভাবে প্রতিধ্বনিত করছেন, যেন অন্তত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটিই চিরন্তন সত্য। কথাটি মূলত সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের। সম্প্রতি মেঘনা নদীতে তাঁর লাশ ভেসে ওঠে। তার আগে একটি সংবাদমাধ্যম বিভুরঞ্জনের ই-মেইল থেকে অনেকটা সুইসাইড নোটের মতো একটি ‘খোলা চিঠি’ পায় ও তাঁর লাশ পাওয়ার আগেই প্রকাশ করে। সেই চিঠিতে বাক্যটি ছিল।পরিবারের সদস্যরা বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুর ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে মনে করছেন; যদিও কেউ কেউ এটিকে ‘সিস্টেমেটিক কিলিং’ হিসেবে দেখছেন। এই ‘পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড’ কীভাবে সংঘটিত হলো, তার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অবশ্য এখনও চোখে পড়েনি। অনেকেই হয়তো বিভুরঞ্জন সরকারের পরিণতির মধ্যে নিজেদের হতাশার প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছেন।প্রশ্ন জাগে, ‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়’ তত্ত্বে বিশ্বাসীদের কেউ কি মিথ্যা শাসনের যুগে সাংবাদিকতাকে সত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন? সাংবাদিকতা ও মিডিয়া শিল্পের দুর্দশা যদি ব্যক্তি-সাংবাদিকের আত্মহননের কারণ হয়ে থাকে, তবে সে দায় অনেকটাই রাজনীতির ও শাসন ব্যবস্থার।২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদী যুগে রাজনৈতিক বয়ান ও সংস্কৃতি ‘রান্নাবান্না’ করতে গিয়ে সৎ সাংবাদিকতাকে কার্যত মেরে ফেলা হয়েছিল। তাতে স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠীর ভূমিকা পালন করেছে সংবাদমাধ্যমেরই একটি সুবিধাভোগী অংশ। অবৈধ বৈষয়িক সুবিধা ছাড়াও আর কী কী তারা চেয়েছিলেন, বোঝা মুশকিল। তারা কি ভেবেছিলেন, দালালির মধ্য দিয়ে দেশের সাংবাদিকতা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে আর পাঠক-দর্শক বাহবা দিতে থাকবে? সত্যনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতা সংবাদমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা আনে। অধিক পাঠক-দর্শক টানে, প্রতিষ্ঠানের আয়-রোজগার বাড়ায়। এটি সারাবিশ্বের মোটামুটি প্রমাণিত মডেল। আর বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে ছড়ানো-ছিটানো থাকে; সেগুলো নিজে এসে সাংবাদিকের কাছে ধরা দেয় না। খুঁজে নিয়ে সত্য প্রকাশের মূল্যও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবাদিককে দিতে হয়। সে জন্যই সভ্য সমাজ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও ক্ষুরধার সংবাদ বিশ্লেষণকে কদর করে। এর অন্যথা হলে কী ঘটে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ ফ্যাসিবাদী জামানার অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম। তারা জার্নালিজম না যতখানি করেছে, অ্যাক্টিভিজম করেছে তার বেশি। এতে বারোটা বেজেছে পেশার। রুগ্ণ হয়েছে শিল্প। মাঠে মারা পড়েছে সাংবাদিক কল্যাণের এজেন্ডা। আধুনিক বিশ্বে কার্যকর গণতন্ত্র, ন্যায়ভিত্তিক মুক্তবাজার, সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থায় সাংবাদিকতার বিকাশ হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের আন্দোলন-সাংগ্রামের মধ্য দিয়েই মুক্ত সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা এগিয়েছে তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশে। বাংলাদেশেও আমরা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অগ্রযাত্রা দেখি ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে। কিন্তু শেখ হাসিনার শাসনামলে পরিস্থিতি উল্টে যায়। সে সময় নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস ও বিচার বিভাগের অপব্যবহারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের বলিদানে সাংবাদিকদেরও একটি সুবিধাভোগী অংশ শরিক হয়। সবশেষে নিজেরাই ‘বলির পাঁঠা’ হয়ে যান। ফ্যাসিবাদী আমলে যে দু-চার-দশজন সাংবাদিক সঠিকভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন, তাদের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার শিকার হতে হয়েছে। সাংবাদিকতার সর্বনাশে দেশ-জাতিরও সর্বনাশ হয়েছে। এ কারণে যা হওয়ার কথা ছিল, তা-ই হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার পতনের পর বেশ কিছু সাংবাদিককেও পালাতে হয়েছে। সুতরাং সাংবাদিকতা ও মিডিয়া শিল্পের চলমান সংকটের জন্য নিজেদের বাইরে একক কাউকে যদি দোষারোপ করতে হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি হলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এখনও অনেক সাংবাদিক বুঝতে চান না, অযোগ্যতা ও দাস প্রবৃত্তি দিয়ে আর যা-ই হোক, মুক্তচিন্তার সাংবাদিকতা হয় না। লেখক-সাংবাদিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ভাষায় সাংবাদিকতা ‘দ্য বেস্ট প্রফেশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। এখানে কাজ করতে পারেন পরস্পর তর্কবিতর্ক করা সাংস্কৃতিকভাবে পরিশীলিত এক দল মানুষ বাংলাদেশে ক্ষয়িষ্ণু গ্রহণযোগ্যতার পেশা এবং অস্তিত্বের সংকটে থাকা শিল্পে বিভুরঞ্জন সরকারের মতো অনেকের সমস্যাটি অন্যত্র। বিভুরঞ্জনেরই প্রজন্মের সাংবাদিক এবং আশি ও নব্বইয়ের দশকে আলোচিত সাপ্তাহিক বিচিন্তা সম্পাদক মিনার মাহমুদের মতো। তিনি একসময় যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। অনেক পরে ঢাকায় ফিরে দেখেন, নতুন প্রজন্মের পাঠকরা তাঁকে ‘চিনছে না’। দুর্ভাগ্যজনক, তিনিও আত্মহত্যা করেন, ২০১২ সালে।বিভুরঞ্জন সরকারও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের কলাম লেখক ‘তারিখ ইব্রাহীম’ হিসেবে। তিনি ও মিনার সম্ভবত আশি ও নব্বইয়ের দশকে ফেলে আসা গৌরবোজ্জ্বল পেশাগত অধ্যায় নিয়ে স্মৃতিমেদুর ছিলেন। দুজনেই হয়তো এটাও মানতে পারেননি– জীবন ও পেশায় আপনি সব সময় হিরো থাকতে পারবেন না। অন্যান্য মহান পেশার মতোই সাংবাদিকতা শুরু করলেই কেউ ‘শাইন’ করবেন বা আজীবন ‘সেলিব্রিটি’ থাকবেন– এমন কথা কোথাও লেখা নেই। পৃথিবীর কোথাও সাংবাদিকতা নিষ্কণ্টক পেশাও নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা এই পেশা বেছে নিয়েছিলাম নিজস্ব সিদ্ধান্তে। সমাজের মানুষ আমাদের বাধ্য করেনি। প্রথিতযশা সাংবাদিক হলেও আমাকে সারাক্ষণ সমাদর করার ফুরসত জনসমাজের নেই। এখানে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে হয় প্রতিদিন।সফল সাংবাদিক সবাই সেলিব্রিটি নাও হতে পারেন। কেউ কেউ ‘আনসাং হিরো’ থেকে যান। যদি কাজের উদ্দেশ্য ঠিক থাকে, তাহলে সাংবাদিকের হতাশার কোনো কারণ নেই। সমাজ ও রাষ্ট্রের ত্রুটি শোধরানো এবং পরিবর্তন আনার মধ্যেই মূলত সাংবাদিকতার সার্থকতা নিহিত।অনেক আগে এক শায়েরিতে পড়েছিলাম: ‘খোদাসে হুসনুনে একদিন এ সওয়াল কিয়া/ জাহাঁমে তু মুঝে কিউ না লাজওয়াল কিয়া/ মিলা জবাব তসবিরখানা হ্যায় দুনিয়া/ সবে দরাজে আদম কা ফসানা হ্যায় দুনিয়া…।’ বাংলায় মোটামুটি অর্থটা এ রকম: খোদাকে একদিন প্রশ্ন করল রূপ, ‘হে খোদা, দুনিয়ায় আমাকে অমর করোনি কেন?’ উত্তর এলো, এ দুনিয়া হলো পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাগৃহ। স্বল্পস্থায়ী জীবনই হলো রূপের আয়ু, এ সত্যই রূপকে এত আকর্ষণীয় করেছে, করেছে মূল্যবান।’ সাংবাদিকের নাম-যশ ফুলের মতোই সুন্দর; কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। এ সত্যকে মেনে নিলে বঞ্চনার বিষে কাবু হতে হয় না। এ সত্য মেনে নিলে হয়তো মিনার মাহমুদ বা বিভুরঞ্জনদের অভিমানী প্রস্থানও দেখতে হয় না।
খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক


