একটি জাতি গঠন দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। যার জন্য অন্যান্য অনেক উপাদানের পাশাপাশি এমন একজন বীরের প্রয়োজন হয় যাকে দেশের জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ গ্রহণ করে। ঔপনিবেশিক-পরবর্তী দেশগুলোতে এই ধরনের বীর মূলত সেই ব্যক্তিকে গণ্য করা হতো, যিনি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করে দেশকে স্বাধীনতার দিকে পরিচালিত করেছিলেন। একজন দেশনায়ক, মানুষ হিসেবে নিখুঁত নাও হতে পারেন। আর তাই একটি গণতন্ত্রে, তার কিছু সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রজন্মের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ এবং সমালোচিত হয়। গণতন্ত্রের বিপরীতে একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় একজন শাসক প্রায়শই তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দেশের নায়কের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে থাকেন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার ভূমিকা নিয়ে কোনও গুরুতর বিতর্কের সুযোগ দেন না।এমনই একজন বীর হলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাধর অভিজাতদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দেশের ইতিহাসে মুজিবের অবদানকে বিরোধীরা যতই নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করুক না কেন, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নেতৃত্বের ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এই বছর মুজিবের (১৯২০-১৯৭৫) ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুজিবকে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে হত্যা করা হয়। তার উপর অসন্তুষ্ট সেনা কর্মকর্তারা তাকে হত্যা করেন। ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনের অধীনে হোক বা সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার, মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য আখ্যানগুলোও জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই বছরগুলোতে ইসলামপন্থীরাও বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভিত্তি অর্জন করে।
বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের বীরোচিত ভূমিকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে মুজিবের নেতৃত্ব কতটা গণতান্ত্রিক ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য তার সরকার জাতীয় রক্ষী বাহিনী (ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স) গঠন করে, যা মূলত তার রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর নৃশংসতা চালায়। মুজিব সরকার দেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করে, একদলীয় শাসন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করে। ১৯৭৫ সালে সাংবিধানিক সংশোধনীর পর বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অধীনে অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৭৫ সালের জুন মাসে বেশিরভাগ সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়।কিছু ক্ষেত্রে, ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিবৃত্ত করার জন্যও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ইতিহাস তৈরি করা হয়। আর তাই প্রতীকগুলো একটি জাতির মনন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং প্রায়শই সহিংস ঐতিহাসিক ভাঙ্গনের কারণে পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে মুজিবের ভূমিকা মুছে ফেলা যাবে না। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্নভাবে তা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। হাসিনা-পরবর্তী যুগে মুজিবের মূর্তির উপর আক্রমণ এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন মূলত হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রতিফলন। যিনি তার স্বৈরাচারী শাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য বাবার ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করেছিলেন। এখন মুজিব বিরোধী শক্তিগুলোও ভুল ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার করছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট
লেখক অমিত রঞ্জন/



