বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বার

আপডেট:

মাহফুজ রহমান
মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যের কিয়াকফিউতে চীনের নির্মিত কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু। বন্দরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রথম ব্যাখ্যাই আসে চীনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত দুর্বলতা থেকে। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরগুলো থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা বা ইউরোপে যেতে মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে লম্বা পথ অতিক্রম করতে হয়। এটি শুধু ধীর নয়, ভূরাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণও। কারণ মালাক্কা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর যৌথ প্রভাব বলয়ের কাছে। এ জায়গাতেই কিয়াকফিউ বন্দর চীনের জন্য বিকল্প পথ খুলে দেয়। বঙ্গোপসাগরের ওপর সরাসরি মুখ থাকা কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট থেকে ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত চীনের স্থলভাগের পাইপলাইন ও হাইওয়ে সংযোগ তৈরি হওয়ায় বেইজিং ‘স্ট্রেইট অব মালাক্কা বাইপাস’ কৌশল পেয়েছে। এ বিকল্প রুট চীনকে মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে দ্রুত, নিরাপদ ও অধিক কার্যকর বাণিজ্যপথ ব্যবহার করার সুযোগ দেয়। যে কারণে বঙ্গোপসাগরে কিয়াকফিউ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য এটি জ্বালানি নিরাপত্তার কোর নোড। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েল ও গ্যাস সরাসরি কিয়াকফিউতে এসে পাইপলাইনে চড়ে ইউনান পর্যন্ত যায়—যেখানে আগে একই জ্বালানি মালাক্কা পেরিয়ে সমুদ্রপথে পৌঁছতে হতো। একই সঙ্গে এটি চীনের নৌশক্তির জন্য লজিস্টিক সুবিধা তৈরি করে, যা ভারত মহাসাগরে তাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিকে শক্তিশালী করে। ফলে কিয়াকফিউ শুধুই বাণিজ্যিক বন্দর নয়, এটি ভবিষ্যৎ সামরিক-লজিস্টিক নেটওয়ার্কে পরিণত হওয়ারও সব বৈশিষ্ট্য রক্ষা করছে।কিয়াকফিউ থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রপথে দূরত্ব খুব বেশি নয়—প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল, রুটভেদে কমবেশি। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের একই উত্তর-পূর্ব করিডোরে দাঁড়ানো দুটি আঞ্চলিক পোর্ট—একটি চীনের কৌশলগত অ্যাসেট, অন্যটি বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্যদ্বার। এ ভৌগোলিক নৈকট্যই বন্দরটিকে বঙ্গোপসাগরে পোর্টভিত্তিক ভূরাজনীতির নজরে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চীন কিয়াকফিউ বন্দর হয়ে যে নতুন বাণিজ্যপথ তৈরি করছে, সেই করিডোরের পরবর্তী সম্ভাব্য বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় থাকে।এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বার। বঙ্গোপসাগরের অন্যতম কৌশলগত পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম। কিয়াকফিউতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে ওঠার পর থেকে এ পুরো উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বেড়েছে। কিয়াকফিউর পর স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরেও বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ বাড়বে, কারণ এ দুই বন্দর মিলেই মূলত বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশের সামুদ্রিক রুট ও লজিস্টিক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় অংশ নির্ধারিত হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের কৌশলগত গুরুত্ব তাই এখন অনেক বেশি।’ চট্টগ্রাম বন্দর বড় শক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বন্দরকে ঘিরে আমরা যাই করি না কেন বড় শক্তিগুলো নজর রাখবে। এটা বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগর ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অংশ।’চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দর। দেশের মোট আমদানি-রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ এ বন্দরের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি ডিপ-সি পোর্ট নয়। এখানকার নাব্য সীমিত, বড় মাদার ভেসেল সরাসরি ভেড়ানো যায় না। ট্রান্সশিপমেন্ট করতে হয় কলম্বো, সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্রবন্দরে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর নিকট ভবিষ্যতেও সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো আন্তর্জাতিক ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ সিস্টেমের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগকারীদের বড় আকারের পরিকল্পনায় আগ্রহ কমিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু ভৌগোলিক কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়, বরং ভূরাজনৈতিক নানা প্রেক্ষাপটে বেড়েই চলছে।এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘কৌশলগত কারণে পোর্টভিত্তিক ভূরাজনীতির প্রভাব যে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর পড়ছে, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। শুধু চট্টগ্রাম নয়, মাতারবাড়ীও একই কৌশলগত ভূরাজনীতির অংশ। জাপানিরা যখন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প হাতে নেয়, তখন খুব স্পষ্টভাবে বলেছিল—এ বন্দর ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চল, মিয়ানমার ও আশপাশের দেশের জন্য একটি আঞ্চলিক হাব হিসেবে কাজ করবে। এ ঘোষণার পরই চীন নড়েচড়ে বসেছিল। তারা এরই মধ্যে মিয়ানমারের কোকো দ্বীপে একটি স্থায়ী নৌঘাঁটি স্থাপন করেছে। যেটা নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করছে। চীন পশ্চিম মিয়ানমারের দিকেও নতুন করে মনোযোগ দিয়েছে—যে কাজটা তারা আসলে সোনাদিয়ায় করতে চেয়েছিল, কিন্তু কৌশলগত চাপের মুখে বাংলাদেশে শেষ পর্যন্ত সেই প্রকল্প আর এগোয়নি।ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর ঘিরে চীনের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর আন্তঃপ্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে না হলেও চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্লেষকরা ‘সেকেন্ডারি কৌশলগত নোড’ মনে করছেন—অর্থাৎ আঞ্চলিক সমীকরণে যাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। চট্টগ্রাম বড় জাহাজ ভেড়াতে না পারলেও অবস্থানগত কারণে এটি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিপিং পয়েন্ট। ফলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় বন্দরটির ইকনোমিক-জিওগ্রাফিক ভ্যালু রয়েছে। চীনের কিয়াকফিউ পোর্ট কার্যত একটি কৌশলগত ল্যান্ডমার্ক। বিপরীতে এর নৈকট্য চট্টগ্রাম বন্দরকে অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির দৃষ্টিতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।এ বিষয়ে লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের যতটা গুরুত্ব, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর অবস্থান এবং এটাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভূরাজনীতির কারণে। চট্টগ্রাম বন্দর হিসেবে খুব বেশি সক্ষম নয়, এর ক্যাপাসিটি সীমিত, আর সেটাকে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো বানানোর বাস্তব সম্ভাবনাও কম। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। জাপান যে ডিপ-সি পোর্টে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে, সেটাকে শুধু অর্থনৈতিক হিসাবে দেখলে হবে না। একটি দেশ যখন নিজ দেশের বাইরে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্পে যায়, তখন সে শুধু রিটার্নের হিসাব করে না; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সাপ্লাই চেইন, ভবিষ্যৎ জোট রাজনীতি—এসব ভূরাজনৈতিক সমীকরণও মাথায় রাখে। এটা খুব স্বাভাবিক যে চীন হোক বা যুক্তরাষ্ট্র সবাই চাইবে বাংলাদেশ তার জোটে যুক্ত হোক। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশীদের দেয়ারও ভূরাজনৈতিক দিক আছে বলে আমি মনে করি। এটা ঘটছে আবার অনির্বাচিত সরকারের আমলে, যেটা গণ-অভ্যুত্থানের পর পর এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সুত্র : সহযোগী দৈনিক বনিক বার্তা

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত