রোমের রাস্তায় সেই রাতে লাখো মানুষ কলোসিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন। ২০০৬ সালের ৯ জুলাই রাতে বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে শেষ পেনাল্টি জালে যাওয়ার পর ক্যানাভারো যখন ট্রফি তুলে ধরলেন সেই সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ল গোটা ইতালিতে।রোমের রাস্তায় সেই রাতে লাখো মানুষ কলোসিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন আনন্দে, গর্বে, ভালোবাসায়।ইতালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকার মার্কো চিভোলি চিৎকার করে বলেছিলেন ‘ইল চিয়েলো এ আজ্জুরো সোপ্রা বার্লিন’ অর্থাৎ বার্লিনের আকাশ নীল। রোমের আকাশও নীল হয়ে গিয়েছিল সে জার্সির রঙে। ফুটবল বিশ্ব যাকে চেনে আজ্জুরি নামে নীলের দল, গর্বের দল, ইতিহাসের দল। রক্ষণভাগের কবিতা আর আক্রমণের রোমান্টিকতা একসুতোয় বেঁধে যে ফুটবল ইতালি বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল, তার তুলনা ছিল না। চারটি সোনালি ট্রফি যাদের ইতিহাসের বুকে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে আছে—সেই দেশের ফুটবল আজ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। টানা তিনটি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি আজ্জুরিরা।অথচ সে নীল জার্সির ভেতরে যে মানুষগুলো ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই একটা করে যুগ। ফ্রাঙ্কো বারেসি যখন বল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেন, মনে হতো পৃথিবীটা থেমে যায়। রক্ষণ যে কেবল ধ্বংস নয়, সৃষ্টির কাজও এটা ‘পিস্কিনিন’ নামে খ্যাত বারেসিকে না দেখলে বোঝা যেত না। তার পাশে পাওলো মালদিনি। বাঁ পায়ে দুনিয়া কাঁপানো এক মানুষ, যার ট্যাকেল ছিল অস্ত্রের মতো নির্ভুল, কিন্তু ফুটবলের মতোই সুন্দর। মালদিনি আক্রমণে উঠে যেতেন, সেন্টার ফরওয়ার্ডের মতো বল বানাতেন, আবার নিজের জায়গায় ফিরে শত্রুর বুকে শূল হয়ে বসে থাকতেন।তারও আগে, ১৯৮২ সালের স্পেনে, পাওলো রোসি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো জেগে উঠেছিলেন। দুই বছর ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে নির্বাসিত থেকে সবে ফিরেছেন, বিশ্বকাপে গোল নেই প্রথম তিন ম্যাচে। সবাই ভেবেছিল শেষ। তারপর ব্রাজিলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। সেই দলে জিকো ছিলেন, সক্রেটিস ছিলেন, ফ্যালকাও ছিলেন। ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দলটাকে সেদিন রোসি একা হাতে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আরো দুটো।ঝাঁকড়া চুলের রবার্তো ব্যাজিও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে একা কাঁধে বহন করেছিলেন গোটা ইতালিকে। বারবার বাঁচিয়েছেন, গোল করেছেন। ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার পরও পুরো পৃথিবী ব্যাজিওকে ভালোবেসেছিল।হালের আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো ছিলেন জাদুকরী পায়ের অধিকারী, যার ফ্রি-কিক দেখার জন্য গ্যালারি নিশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকত। আর ফ্রান্সেস্কো টোট্টি ছিলেন রোমার রাজপুত্র। ‘টোট্টির বাঁ হাতে ফোন দিলেও সে বল বানিয়ে দিত’—এ রসিকতা ইতালিয়ানদের মুখে মুখে। আর জিয়ানলুইজি বুফন গোলপোস্টের সামনে যখন দাঁড়াতেন, মনে হতো দেয়াল উঠে গেছে। ২০০৬ বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র দুটো গোল খেয়েছিল ইতালি—যার একটা আত্মঘাতী। অন্যটি ছিল ফাইনালে জিনেদিন জিদানের নেয়া পেনাল্টি গোল। অর্থাৎ ওপেন প্লে-তে কোনো গোল হজম করেনি বুফনের দল। আর আন্দ্রেয়া পিরলো যাকে বলা হয় ফুটবলের মস্তিষ্ক। বিখ্যাত ডিপ-লায়িং প্লেমেকার রোলে পিরলো পুরো দলটাকে পরিচালনা করতেন অর্কেস্ট্রা পরিচালকের মতো।
ইতালির ফুটবলের একটা নিজস্ব দর্শন ছিল। ক্যাতেনাচ্চো—সোজা বাংলায় তালাবদ্ধ রক্ষণ। অনেকে এটাকে বিরক্তিকর, রক্ষণশীল, এমনকি ভীরুও বলেছে। কিন্তু এ দর্শনের ভেতরেও নিষ্ঠুর সৌন্দর্য ছিল। যেভাবে একজন শিকারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিঃশব্দে অপেক্ষা করে, তারপর ঠিক মুহূর্তে থাবা মারে—ক্যাতেনাচ্চো ছিল সে রকম। সিরি-আ একসময় এ দর্শনের পীঠস্থান ছিল। রোনালদো নাজারিও ইন্টারে খেলতে এসেছিলেন, জিনেদিন জিদান জুভেন্টাসে, শেভচেঙ্কো মিলানে। পৃথিবীর সেরা ফুটবলাররা ইতালিকে তাদের গন্তব্য মনে করতেন।কিন্তু ফুটবল যেমন গৌরবের-সৌন্দর্যের, তেমনই নিষ্ঠুরতারও। সেই নিষ্ঠুরতার অদ্ভুত বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে ইতালি। বিশ্বকাপের মঞ্চ প্রস্তুত হয় কিন্তু সেখানে ইতালি নেই। একবার নয়, দুইবার নয়, টানা তিন বিশ্বকাপে। গত ৩১ মার্চের মতো এমন রাত ফুটবলের ইতিহাসে আর আসেনি। কোনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কখনো টানা তিনটি বিশ্বকাপের বাইরে থাকেনি—এ ‘কলঙ্কিত’ রেকর্ড এখন ইতালির। জেনিকার তিক্ত রাতে, বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে পেনাল্টির নির্মম লটারিতে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে আজ্জুরিদের।অথচ চারটি বিশ্বকাপ তাদের ঘরে। ১৯৩৪ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে শুরু হয় এক দীর্ঘ অধ্যায়। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। তারপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ১৯৮২ সালে স্পেনে পাওলো রোসির পায়ে ভর করে তৃতীয়বার বিশ্বজয়ের আনন্দে ডুব। সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারানো ছিল যেন ফুটবলের দার্শনিক একটা বিজয়— সুন্দরের বিপক্ষে শৃঙ্খলার, কবিতার বিপক্ষে গদ্যের জয়। আর ২০০৬ সালে জার্মানিতে চতুর্থবার। মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে জিনেদিন জিদানের সেই বিখ্যাত গুঁতো আর পিরলোর ভুরু কুঁচকে পেনাল্টি মারার দৃশ্য বিশ্ব ফুটবলের চিরস্থায়ী স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।
যে দেশ বিশ্বকে রক্ষণের কবিতা শিখিয়েছিল, সেই দেশ এখন প্লে-অফে ৭১তম র্যাংকধারী দলের কাছে হেরে বিশ্বকাপের মূল পর্ব থেকেই ছিটকে পড়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এ ব্যর্থতার শিকড় গভীরে। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর ইতালির ক্লাবগুলো বিদেশী খেলোয়াড়ের মেলায় মেতে ওঠে। সিরি-আতে ইতালীয় ছেলেরা জায়গা পাওয়া বন্ধ করে দেয়। একাডেমিগুলো থেকে প্রতিভা উঠে আসার পথ সরু হয়ে যায়। স্পেন যখন তাদের লা মাসিয়া, আজাক্স মডেল অনুসরণ করে গোটা দেশের ফুটবল কাঠামো পাল্টাচ্ছিল, ইতালি তখন সেই পুরনো জৌলুসের আলোয় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এককালে যেখানে ফিলিপ্পো ইনজাগি বা ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরির মতো গোলমেশিন ছিল, সেখানে আজ জাতীয় দলকে ভরসা করার মতো একজন ফরওয়ার্ড পেতে দিগ্বিদিক ছুটতে হয়। এ স্ট্রাইকার সংকটের কারণে বাছাই পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে প্রতিপক্ষের ছোট ছোট দলের বিপক্ষেও তারা গোল করতে ব্যর্থ হচ্ছে। রক্ষণের যে প্রাচীর ছিল তাদের অহংকার, সেই প্রাচীরও এখন জরাজীর্ণ।আধুনিক ফুটবল এখন উচ্চগতির, প্রেসিং ও ট্রানজিশনের খেলা। ইতালির ঐতিহ্যগত ক্যাতেনাচ্চো দর্শন এ যুগে সেভাবে কাজ করে না। কিন্তু নতুন দর্শনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হওয়াও সহজ নয়। এ দোটানায় ইতালি মাঝামাঝি একটা জায়গায় আটকে গেছে। পুরনো পথটাও ছাড়তে পারছে না, নতুন পথেও ঠিকঠাক হাঁটতে পারছে না। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ছোট দলের বিপক্ষেও এ দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বারবার। বিশেষত প্লে-অফের মতো নক-আউট পরিস্থিতিতে ইতালির খেলোয়াড়রা বারবার গুটিয়ে গেছেন। প্রত্যাশার ভার বহন করতে না পেরে খেলার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছেন। এছাড়া মাঠের বাইরে ফেডারেশনে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দুর্বল পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক টানাহেঁচড়া ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।বারেসি যে মাটিতে দাঁড়িয়ে রক্ষণকে শিল্প বানিয়েছিলেন, সে মাটি থেকে উঠে আসা দল আজ রক্ষণ সামলাতে পারছে না। মালদিনি যে জার্সিতে তিন দশক রাজত্ব করেছিলেন, সেই নীল জার্সি এখন বিশ্বকাপের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আজ্জুরিদের সেই নীল আভিজাত্য এখন কেবল ইতিহাসের ধুলোমাখা ট্রফি আর নস্টালজিয়ায় বন্দি। এই যে রক্তের উত্তরাধিকার আর ফুটবলের ধ্রুপদী ব্যাকরণ, তা যেন কোনো এক অলক্ষ্য অভিশাপে পথ হারিয়ে ফেলেছে; যেখানে পূর্বসূরিদের বীরত্বগাথা আছে ঠিকই, কিন্তু সেই মশাল বয়ে নেয়ার মতো যোগ্য উত্তরসূরি নেই।
আজ্জুরিদের সেই নীল আভিজাত্য এখন কেবল ইতিহাসের ইতালি বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে বিদায়
আপডেট:

