#_চাটুকার_ও_দুর্বৃত্তের_সমাজে
#____অসহায়_রফিক_মাস্টার
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় একটু সততার সাথে চলতে চেষ্টা করাটা যে কতবড় বোকামি তা আজ আমি বুঝি। মনখারাপের এক বিকেলে আরো মনখারাপ করে দিতে আমাদের রফিক ভাই বর্তমানে একটি বেসরকারি এমপিওভুক্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক এই কথাগুলো বলেছেন। তার সাথে আমার সম্পর্ক পারিবারিক পর্যায়ে। চা খেতে -খেতে মনের লুকোনো হতাশা, ব্যর্থতা ও দুঃখকষ্টগুলো আমার সাথে শেয়ার করলেন।
দেখ পিটু,আমার ছেলেটা দুদিন হলো খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সাইকেলের জন্য। অবশ্য একবছর পূর্বেই সে তার মা’কে বলে রেখেছিল আমাকে রাজি করিয়ে সাইকেল কিনে দিতে। মা ছেলেকে কথা দিয়েছিল, পরীক্ষায় ভালো করলে আমাকে বলে সাইকেলের ব্যবস্থা করে দিবে। এখন কষ্টকরে যদিওবা সাইকেলটা কিনে দিই তবে পরের বছর চাইবে মোটরসাইকেল তখন আমি কি করবো? এমনিতেই পাঁচজনের পরিবার তার উপর বাসাভাড়া, বাজারখরচ থেকে বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ, এই অল্প বেতনে সংসার টেনে নিতে আমার খুব কষ্ট হয়। তার উপর মেয়ে বড় হচ্ছে, তার বিয়ের খরচের কথা চিন্তা করলে চোখমুখে অন্ধকার নেমে আসে।
ভাগ্য কতটা খারাপ দেখ পিটু, আমাদের শহরতলীর পাশাপাশি বাড়ির মতিন যে কিনা ছোট্ট থাকতেই আর্থিক দৈন্যতা আর বখাটেপনার জন্যে টেনেটুনে মেট্রিক শেষ করে আর পড়েনি। এ-ওর থেকে ৫০/১০০ টাকা খুঁজে বা চাঁদাবাজি করে গ্রামের রাস্তায় বা চা দোকানে আড্ডা দিয়ে দিন পার করতো। সেই মতিন চাটুকারিতে দক্ষতা দেখিয়ে সমাজের নেতা হয়ে আজ আমাদের চেয়ারম্যান। চাকরি বা ব্যবসা না করেও আমার ভাড়াবাসার সামনে জায়গা কিনে ছয়তলা বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছে ।
আমার বউ-বাচ্চারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমার আর পূর্বের বখাটে মতিনের বর্তমান সামাজিক অবস্থানের ব্যবধান। মতিনের ছেলেকে ড্রাইভার গাড়ি করে স্কুলে নিয়ে যায়। আর আমার ছেলে মেয়ে কে স্কুলে যাবার রিকশা ভাড়া দিতে আমার কষ্ট হয়। এই বৈষম্যমুলক সমাজ ব্যবস্থায় আমাদের বাচ্চাদের মানুষ হয়ে ওঠার কোন সম্ভাবণা কী আছে ?
এই ব্যার্থ জীবনে কিছুই করতে পারিনি বলে বউ -বাচ্চারা প্রতিনিয়ত খোঁটা দেয়। ছেলে বলে – আমার বন্ধুরা গাড়িতে করে স্কুলে যায়। আর তুমি আমাকে একটি সাইকেল কিনে দিতে পারছনা ? বাচ্চাদের ছোটখাটো আবদার পুরন না করতে পারা যে কী কষ্টের তা বাবা-মা ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারবে না। এই সমাজব্যবস্থায় আজ শিক্ষক হয়ে নিজের বাচ্চাদের নৈতিকতার শিক্ষা দিতে আমার লজ্জা হয়!
আমি ইন্টারে পড়া অবস্থায় বাবা মারা যায়। পড়ার খরচ চালাতে আমাকে প্রাইভেট টিউশানি ও পরে ইন্টার পাস করে শিক্ষকতা শুরু করতে হয়। ফেনীর সনামধন্য স্কুলের আমিও মেধাবী ছাত্র ছিলাম। আমার থেকে কম মেধার অনেক বন্ধু ও স্বজন চাকরি বা ব্যবসায় আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সেজন্য কোন দুঃখ নেই, তারা পরিশ্রম করে সফলতা পেয়েছে। কিন্তু দুঃখ হয় যখন দেখি ভোগবিলাসে মত্ত মতিনেরা সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। আর অভাবের কারনে আমি ভালোভাবে লেখাপড়া শেষ না করে, জীবনে উন্নতি করতে না-পারার হতাশা নিয়ে বেঁচে আছি।
একরোখা মনোভাবের কারনে এই বয়সে এসেও কারো প্রিয় হতে পারলামনা। অনৈতিক সুবিধা দিতে না পারায় স্কুলের সহকারী শিক্ষক থেকে দপ্তরি পর্যন্ত সবারই অপছন্দের তালিকায় আমি। সে অপছন্দের মিছিলে স্ত্রী বাচ্চারাও আছে। আজ নিজেকে সমাজে খুব বেমানান লাগে।
আজকাল মাঝে মাঝে দোদুল্যমান মনে একটা চিন্তা আসে তা হলো-একটু অসততা, দুর্বৃত্তায়ন ও চাটুকারিতা সংমিশ্রণে স্কুলের টাকা মেরে আমিও, মতিনের মতো না হলেও শহরে একখণ্ড জমি, ছোট্ট একটি বাড়ি, ছেলের জন্য সাইকেল এবং মেয়ের ছোটখাটো আবদার মিটিয়ে তথাকথিত সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারি, যা অনেক শিক্ষক করেছে। কিন্তু আমার বিবেক সাড়া দেয়না। এই ক্ষুদ্র জীবনে একমাত্র অর্জন -এই সামান্য সততা টুকু বিসর্জন দিলে আমার আর কি থাকে বল ?
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনা বা উত্তর খুঁজে পাই না। নিজের অজান্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠে; এক সময়ের নামপরিচয়হীন অদক্ষ, অযোগ্য মুখগুলো কি যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় চাকরি বা ব্যবসা না করেও হঠাৎই বাড়ি গাড়ির মালিক বনে যায়। এসি গাড়িতে চড়ে ফুলস্পিডি আমাকে অতিক্রম করে যেতে-যেতে হাত নাড়ে বা সালামের ভঙ্গিতে হাত তুলে, তখন এই আমি কী স্বাচ্ছন্দ বোধকরি ? নিজেকে প্রশ্ন করি।বারবার প্রশ্ন করে উত্তর খুজতে থাকি!
চাওয়া পাওয়ার হিসেব মিলাতে গিয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে আমাদের লাভক্ষতির অংকটা। তাদের এত্তো এত্তো টাকা,বাড়ি,গাড়ির জৌলুশ আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আমরা জনগণ অসহায়ের মতো চেয়ে থাকি, চোখ ফেরাতে চাইলেও পারিনা। ক্ষনিকের জন্য চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
মানুষের সেবা করার পদ এরা কেড়ে নিচ্ছে মানুষের ভোট ছাড়া। এই পদ কে ওরা ব্যবহার করছে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে। সহায়সম্বলহীন এইসব হতদরিদ্র নেতা- দরিদ্র ও অসহায় জনগনের সেবা করার শপথ নিয়ে নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে যায়। বড় থেকে পাতিনেতা ও তাদের চেলা চামুন্ডরা ঘুণপোকা ও উইপোকা’র মতো চেটেপুটে পুরো মানচিত্র খেয়ে ফেলেছে। লোভ আরো আরো পাওয়ার বাসনা এদেরকে মানব থেকে দানবে পরিনত করেছে, আমরা না দেখার ভান করে মেনে নিচ্ছি।
নিষ্ঠুর এক প্রতিবেশীর অন্যায় লালসার শিকার হয়ে কুমারী প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর উর্বশী প্রমত্ত নদীগুলো সতিত্ব হারিয়ে শুকিয়ে-শুকিয়ে মরুভূমি হচ্ছে, সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে চাটারদল আমাদেরকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সেতু উপহার দিচ্ছে বলে বাহবা নিচ্ছে। আমরা তবু্ও বলছি চালিয়ে যাও।
উন্নয়নের নামে চাটারদল সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া আমাদের সন্তানের মাথায় প্রায় লক্ষটাকার ঋণের বোঝা চাপিয়ে লুটপাটের নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে। আমরা তবু্ও উন্নয়নের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি ।
চাটুকার সম্পর্কে ‘রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ‘র
কবিতাটি বেশ লাগে ;
“হাজার সিরাজ মরে
হাজার মুজিব মরে
হাজার তাহের মরে
বেঁচে থাকে চাটুকার, পা-চাটা কুকুর
বেঁচে থাকে ঘুনপোকা, বেঁচে থাকে সাপ”
এতো কিছুর পরেও উজ্জীবিত হই আমাদের
বাতিঘর-আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর
অধ্যাপক ‘আবদুল্লাহ আবু সায়ীদে’র কথায় ;
” সাফল্য একটা দক্ষতা মাত্র। চোর বাটপারও
একসময় সফল হয়ে যেতে পারে। আমাদের
দেশের সফল লোকদের মধ্যে ৮০ ভাগই তো
দুর্বৃত্ত। এমন জিনিস নিয়ে পাগল হওয়ার কি
আছে। সবচেয়ে বড় জিনিস সাফল্য নয়
সার্থকতা। ফুলের অনেক বৈচিত্র্য বা সৌন্দর্য
আছে সেগুলো তার সাফল্য। কিন্তু তার যে
সৌরভ যা আমাদের মন ভোলায় তা হলো
সার্থকতা। ”
#ওহিদুল_আলম_পিটু
মাস্টার পাড়া, ফেনী
২০-০৬-২০২০ইং



