মঙ্গলবার, মার্চ ৩১, ২০২৬

দ্বৈতনীতি শিক্ষা ব্যবস্থা — মাসুম বিল্লাহ

আপডেট:

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সহকারী অধ্যাপক অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারবেন। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হিসেবে তিন বছরের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হিসেবে উচ্চমাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ/ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ/এমপিওতে তিন বছরের সহকারী অধ্যাপক পদে এবং মোট ১২ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থাকার বিধান রয়েছে। ফলে নিয়োগ নিয়ে জটিলতা লেগেই আছে। আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী কলেজে শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে গভর্নিং বডির মাধ্যমে সরাসারি শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে। অথচ ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবরের পর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির ক্ষমতা রহিত করা হয়েছে।পাশাপাশি এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিধান বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। অনার্স মাস্টার্স কলেজে অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হলে কীভাবে নিয়োগ দেয়া হবে, তার বর্ণনা নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালায়। কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্স অনুমতি নিতে গিয়ে তিনজন করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বেসরকারি ডিগ্রি কলেজগুলো। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। দুজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলেও তৃতীয় জন দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত হতে পারছিলেন না। উচ্চ আদালতে গিয়ে বিষয়টির সমাধান করতে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি (পাস) কলেজের এই জনবলকাঠামোকে সমন্বয়হীনতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে দেশের অনার্স মাস্টার্স কোর্সের ৩৫০টি বেসরকারি কলেজের শিক্ষকেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘ ২৮ বছরেও জনবল কাঠামো তৈরি না করায় শুধু অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো অনুযায়ী অনার্স-মাস্টার্স স্তরে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধানে এই সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগে আট শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনার্স মাস্টার্স কোর্স চালু করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও বেগবান, গতিশীল, মানসম্পন্ন ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করা জন্য দেশের সমস্ত বেসরকারি ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজগুলো সরাসরি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্পূর্ণভাবে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। তারা শুধু সার্টিফিকেট দেয়া আর নিয়োগ বোর্ডে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে সেটি হলে এর মান বৃদ্ধি কিংবা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কার্যকরী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।তাই বেসরকারি কলেজগুলোর সব ধরনের নিয়োগ, শিক্ষকদের বেতনভাতা প্রদান, পদোন্নতি ও শিক্ষার মান বৃদ্ধির যাবতীয় কাজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন এবং জাতীয় বাজেটে সেই ধরনের বরাদ্দ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়ার দরকার। মাউশিকে শুধু উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত দায়িত্ব ন্যস্ত করা প্রয়োজন। অযথা মাথাভারি প্রশাসন এবং তথাকথিত উচচশিক্ষা মাউশির অধীনে থাকায় কোনভাবে এর মানও বাড়ছেন আর মাউশিতে কাজের গতি আসছে না। এত বিশাল বহরের কলেজগুলোর সার্বিক দায়িত্ব এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করার ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যলয় একটি অকার্যকরী কিংবা মানহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।অন্যদিকে মাউশি হাজার হাজার সরকারি বেসরকারি স্কুল ও কলেজ নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ন কাজও দ্রুত এবং চাহিদামাফিক সম্পন্ন করা হয়ে উঠছে না। সরকারি যেসব কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হয় সেগুলোক স্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। আমাদের নতুন শিক্ষামন্ত্রী এই ধরনের একটি ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইতিমধ্যে সম্ভবত কাজও শুরু হয়ে গেছে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে কলেজগুলোর স্ট্যাটাস যেমন বাড়বে তেমনি শিক্ষার মানেরও উন্নতি ঘটবে। এসব কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাস নিতে পারবেন এবং ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকগরা মন্ত্রণালয় থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই কলেজগুলোতে ডেপুটেশনে যাবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। তাতে, তারা একটু জবাবাদিহিতার মধ্যে থাকবেন, ফলে পড়াশোনাসহ সার্বিক ক্ষেত্রে অনেকটাই পরিবর্তন ঘটবে।সর্বশেষ বেসরকারি কলেজ পরিচালনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক দুটি বিধিমালায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। একটি অপরটির সঙ্গে সাংঘর্ষিকও। ফলে দুই বিধিমালার আলোকে কলেজ পরিচালনা করতে গিয়ে নানামুখী ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষকরা। আমাদের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং শিক্ষা প্রশাসনকে অধিকতর কার্যকরী ও স্মার্ট করার নিমিত্তে উপরোক্ত বিষয়গুলোতে দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। উপরোক্ত বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত শুধু মন্ত্রণালয় কিংবা শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিতে পারবে না।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত