[২]
পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া দেয়ারবাই বেঙ্গল: মুসলমানের দায় অথবা জিয়ল মাছের নাভিশ্বাস
জিয়াউদ্দিন বুলবুল **কবি ও সাহিত্যেক #
স্যার সৈয়দ আহমদ সম্বন্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা হয় ইদানিং। এই প্রসঙ্গে তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জরুরি। সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের বয়সসীমা নিয়ে সুরেন্দ্রনাথ যে আন্দোলন করেন স্যার সৈয়দ আহমেদ তার একজন সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। আলিগড় কলেজের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে, স্যার সৈয়দ আহমেদকে, ইংল্যান্ড থেকে ১৮৭৩ সালের ২০ এপ্রিল একটি সংক্ষিপ্ত প্রচারপত্র তৈরির জন্য একটি চিঠির মাধ্যমে প্রস্তাব করেন জন কেনেডি। মিস্টার কেনেডি তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন ধর্মীয় কারণে মুসলমান সমাজের সঙ্গে হিন্দুসমাজ কিভাবে সহমত পোষণ করছে না সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রচারপত্রটি তৈরি করতে। তাঁর আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে স্যার সৈয়দ আহমদ এই প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ বাতিল করে দেন। ১৮৭৫ সালে আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকালে থেকেই এই কলেজ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। কারণ উচ্চপদের চাকরি, ওকালতি, ডাক্তারি ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রে ছিল হিন্দুদের একচেটিয়া আধিপত্য। সেই আধিপত্যে শিক্ষিত মুসলমানরা ভাগ বসাবে তা ভেবেই অভিজাত হিন্দুরা আতঙ্কিত হয়েছিলেন। তাদের আক্রমণ সত্বেও সৈয়দ আহমদ উদার ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি হারাননি। ১৮৭৬ সালে কোলকাতায় তিনি এক সংবর্ধনা সভায় সম্প্রীতির স্বপক্ষে বলেছিলেন : হিন্দুস্থানের হিন্দু ও মুসলমানের হলো একজন মানুষের দুটি চোখ ও দুটি হাত। ১৮৪৪ সালে তিনি ঐক্যের স্বপক্ষে লিখেছিলেন, “তোমরা কি একই দেশে বাস কর না? চিতা হোক আর কবর হোক, মৃত্যুর পরে সে তো একই ঠাঁই, একই মাটিতে আশ্রয়। একই মাটিতে তোমাদের চলার পথ, একই মাটিতে দাঁড়িয়ে তোমরা নিশ্বাস নাও। মনে রেখো হিন্দু আর মুসলমান এই দুটি শব্দে শুধু ধর্মের পার্থক্য বোঝায়, আর কিছুই নয়। এদেশে যারা বাস করে, তারা হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, এমন কি খ্রিস্টান হোক — সকলে একই জাতি। তাদের সকলকে মিলতে হবে দেশের মঙ্গলের জন্য সে মঙ্গলে তাদের সকলেরই মঙ্গল”। ১৮৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর লখনৌতে এবং ১৮৮৯ সালের ১৮ মার্চ মীরাটে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি একবারের জন্যও হিন্দুদের কটাক্ষ করেননি। ১৮৮৮ সালে তিনি বলেছেন, “হিন্দু ও মুসলমান ভারতের দুই চক্ষু স্বরূপ। সেখানে গোহত্যা নিয়ে মনকষাকষি অপেক্ষা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বন্ধুত্বই বেশি মূল্যবান, এবং সেটিই আমাদের কাম্য। তিনি জামাল উদ্দিন আফগানির “প্যান-ইসলামীক” আন্দোলনে অংশ নিতে অস্বীকার করেন। আক্রমণ করেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের কর্মসূচি ও চিন্তাধারাকে। কেউ যদি নিজের সম্প্রদায়ের উন্নতির কথা ভাবেন, নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের কথা ভাবেন, অবশ্যই অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ না করে, তাহলে, কি করে তাকে সাম্প্রদায়িক বলা যায়? তাঁকে থিওডোর বেক কোন পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তা তো সকলের জানা। তাছাড়া কিছু কট্টরবাদী মুসলমান তাঁকে বিধর্মী আখ্যা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোপনে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কট্টরবাদী মুসলমানরা কি ‘দ্বিজাতিতত্ত্বে’র প্রচারকের সঙ্গে এরকম আচরণ করবে!
[৩] বাংলা ভাগ : মুসলমানের দায় এবংবিকারগ্রস্ত ইতিহাস
কলকাতার হত্যা যজ্ঞে সোহরাওয়ার্দীর যে ভূমিকা ছিল তা অনস্বীকার্য। তবে, জয়া চ্যাটার্জি তার— “বেঙ্গল ডিভাইডেড : হিন্দু কমিউনালিজম এন্ড পার্টিশন” গ্রন্থে দেখিয়েছেন হিন্দু স্বেচ্ছাসেবকদের এমন অনেক ব্যায়ামাগার ও সংঘ সমিতি ছিল, যাদের কর্মসূচির অন্তর্গত ছিল লাঠি-ছোরা ইত্যাদির সাহায্যে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি। অর্থাৎ তারাও দাঙ্গার জন্য তৈরি ছিল। দাঙ্গার প্রথম চোটে মুসলমানরা দাপট দেখালেও শেষ দাপটটা কিন্তু হিন্দুরাই দেখায়। সমকালীন প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য থেকে শ্রীমতি চ্যাটার্জী প্রমাণ করেছেন যে ছেচল্লিশের সেই কুখ্যাত দাঙ্গা কেবল এক পক্ষের যুদ্ধ ছিল না তা ছিল কলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ স্বল্পস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, যাতে বল্লভ ভাই প্যাটেলের মন্তব্য অনুসারে — Hindus had the best of it অর্থাৎ হিন্দুরাই দাঙ্গায় ফায়দা তোলে বেশি। সত্যিই যদি সরকারি মদদে পূর্বপ্রস্তুতি অনুসারে মুসলমানরা দাঙ্গা করে থাকে তাহলে কি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে হিন্দুরা সেদিনের গৃহযুদ্ধে জয়ী হতে পারত? উক্ত লেখিকা যে সিদ্ধান্তের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন তা সকলের পছন্দ নাও হতে পারে। তার যুক্তি ও তথ্যাবলী থেকে আমরা বুঝতে পারি যে কলকাতার হিন্দুরা তলে তলে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল এবং তৎকালীন বাংলা সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ হিন্দুদের ওই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির আগাম ইংগিতগুলি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। আসলে বাংলা ভাগের জন্য অজুহাত খাড়া করতে বাঙালি হিন্দুদের একটা প্রভাবশালী অংশ এইরকম একটা হত্যাকাণ্ড মনে মনে দৃঢ়ভাবে চাইছিলেন। হিন্দুত্ববাদীরা বলে থাকেন পাকিস্তানের হিংস্র কবল থেকে বাংলার হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য শ্যামাপ্রসাদ বাংলা ভাগের দাবি জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটাই যদি বাংলা ভাগের একমাত্র কারণ হয় তাহলে ভারতের সীমানার মধ্যেও তো অখন্ড বাংলা গড়তে পারতেন শ্যামাপ্রসাদ ও তার সহযোগীরা। কেনই বা তারা ভারতের মধ্যকার অখন্ড বাংলার বিভাজন চেয়ে ছিলেন? উত্তরটা জলের মত পরিস্কার— ভারতের মধ্যে থাকলেও মুসলিম প্রাধান্য যুক্ত অখন্ড বাংলায় পূর্বের মতো হিন্দুদের আর একাধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাই দেখা যায়, ১৯৪৭ এর ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আ্যটলির ঘোষণার দুদিন পরেই শ্যামাপ্রসাদ বাংলার ছোট লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি করলেন যে ভারতের মতন বাংলাকেও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভাগ করতে হবে। বাংলার হিন্দু প্রধান অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে (অমৃতবাজার পত্রিকা ২৪.০২.১৯৪৭)। ইতিমধ্যে ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণা করলে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস নেতারা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন আরো জোরদার করলেন। তারা বক্তৃতা দিয়ে, কাগজে বিবৃতি দিয়ে, বোঝাতে লাগলেন যে হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাংলা ভাগ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বাংলা পাকিস্তানে গেলে তো বটেই, স্বাধীন সার্বভৌম হলেও, এমনকি ভারতে থাকলেও হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য বাংলাকে ভাগ করে হিন্দু প্রধান অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করতে হবে। সরদার প্যাটেল কে লেখা এক চিঠিতে শ্যামাপ্রসাদ বলেন : “পাকিস্তান হোক আর নাই হোক আমরা বাংলার বর্তমান সীমানার মধ্যে দুটি প্রদেশ গঠন করার দাবি করছি।” (দুর্গা দাস, সরদার প্যাটেল করেসপন্ডেন্স ১৯৪৫–৪৬, ৪র্থ খণ্ড, পৃ.৪০)।
১৯০৫ সালে যারা বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন সেই শ্রেণীর মানুষেরা মাত্র ৪২ বছরের ব্যবধানে সেই বাংলাকে ভাগ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। কারণ ১৯৪৭ সালে বাংলার রাজনীতিতে মুসলমানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। বাংলা অখন্ড থাকলে সেখানে হিন্দুদের প্রাধান্যের কোনরকম সম্ভাবনাই নেই। তারা বুঝেছিলেন যে অখন্ড বাংলা যদি ভারতের মধ্যেও থাকে, তাহলেও সেখানে মুসলমানদের প্রাধান্য থাকবে। মন্ত্রিসভার প্রধান একজন মুসলমানই হবেন। এ বিষয়টা হিন্দু নেতাদের একেবারেই না পছন্দ ছিল। তাই “হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষায়” বদ্ধপরিকর থাকতে শ্যামাপ্রসাদ ও অন্যান্য হিন্দু নেতারা বঙ্গভঙ্গের দৃঢ় সমর্থক হয়ে পড়েন। জয়া চ্যাটার্জী তার পূর্বোক্ত গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন, “হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার জন্যই বাংলা ভাগ হয়েছিল’। আর এই বাংলা ভাগে যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল সেই শ্যামাপ্রসাদ কি করে অসাম্প্রদায়িক হন? যে শ্যামাপ্রসাদ নিজের পেশাগত বা রাজনৈতিক জীবনে একদিনের জন্যেও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি, তাকে অসাম্প্রদায়িক বলার মতো এতবড় মিথ্যা, এতবড় নির্জলা অনৃতবাদন আর হয় না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে (১৯৩৪—১৯৩৮) শ্যামাপ্রসাদ তাঁর সমগ্র জীবন, কাজকর্মের মধ্যে কেবল সাম্প্রদায়িকতার স্বাক্ষরই রেখে গেছেন (দ্রষ্টব্য; শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পেপারস)।
তথ্য সুত্র :ফেইসবুক


