বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক – সকল দেশের সেরা

আপডেট:

ধনধান্য পুষ্প ভরা
Iftekher Hossain
ইফেখার হোসেন
* একজন মানুষও যদি লেখা পড়ে সময় কাটায় তারচেয়ে বড় পাওয়া কি হতে পারে?ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক – সকল দেশের সেরা .এই কালজয়ী গানের রচয়িতা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তিনি ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৬ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেছিলেন। এই গানটি প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে।আমি ২০০৭ সালে ইংল্যান্ডে পড়তে যাই এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। অসাধারণ সুন্দর একটি দেশ। কত রংবেরঙের গাছপালা, ফুলফল—কত শত রকম হতে পারে! টকটকে লাল, নীল, বেগুনি, উজ্জ্বল হলুদ, স্নিগ্ধ সবুজের সমারোহ চারপাশে। বিশাল বিশাল সবুজ গাছে ঢাকা মাঠ ও প্রান্তর। হরেক রকম ফুলগাছে ভরা পরিবেশ। চোখ জুড়িয়ে যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্য তখন অনেক মায়া হতো। বেচারা নিশ্চয়ই গ্রীষ্ম কিংবা শরৎকালে ইংল্যান্ড বা ইউরোপের কোনো দেশ দেখেননি। শীতের ভয়াবহ বরফের সময় সেখানে গিয়েছিলেন বোধহয়। গরম জামাকাপড়ও বোধহয় ঠিকমতো নেননি। শীতে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। স্কটল্যান্ড তো অবশ্যই দেখেননি ।তা না হলে কীভাবে লিখতে পারেন—’এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি’?২০১৬ সালে আমাকে কানাডায় যেতে হয়। ইংল্যান্ডের মতো সুন্দর একটি দেশ। চারপাশে সবুজ আর রংবেরঙের ফুল-গাছপালার সমারোহ, সাজানো-গোছানো। স্বর্গ কি এত সুন্দরভাবে সাজানো থাকে? সম্ভব? দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্য আমার মায়া আরও বেড়ে যায়। এখন তো গ্লোবালাইজেশনের যুগ। মোটামুটি সবাই সব দেশ ঘুরতে যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্য সবারই নিশ্চয়ই মায়া হয়। বেচারা।কানাডা খুব সুন্দর একটি দেশ। বাচ্চারা এখানে নিশ্চিন্তে মাঠে খেলতে পারে। প্রতিটি স্কুলে বিশাল খেলার মাঠ, রাস্তায় কোনো যানজট নেই। ১৫০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলে মসৃণ রাস্তায়। সবাই মোটামুটি একে অপরকে সম্মান করে, খুব বেশি ভেদাভেদ নেই। কোনো কাজের জন্য ঘুষ দিতে হয় না। ছাত্র রাজনীতি নেই, ছাত্রী ছাত্ররা পড়ছে, ঘুরছে, আড্ডা দিচ্ছে। । পুলিশের দরজা সাহায্যের জন্য খোলা, ট্রাফিক পুলিশ ঘুষ খাচ্ছে এমন কেউ দেখাতে পারবে না। টরন্টোতে এক দোকানে পিজা খাচ্ছিলাম, আমার চাচার দোকান, আমার পেছনে লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রুডোও পিজা কিনলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই দেশটি যদি গ্রীষ্ম ও শরতে দেখতেন, তাহলে কয়টা গান লিখতেন? আগের গানটি কি সেন্সর করতেন?ঢাকা গেলাম ১০ দিনের জন্য। মাত্রই ছাত্রদের আন্দোলন শেষ হলো। তাও রাস্তায় শুধু যানজট আর যানজট। ধানমন্ডির রাস্তায় আর পার্কে ময়লা-আবর্জনা। হর্নের শব্দ অনেক বেশি, গাড়ি একটার গায়ে আরেকটা। বাংলাদেশের ড্রাইভাররা ফিজিক্সে নোবেল পাওয়ার যোগ্য।যেই স্পেস দিয়ে একজন মানুষ যেতে পারবে না, সেইখান দিয়ে অবলীলায় ফিজিক্সের সব সূত্র ভুল প্রমাণ করে গাড়ি ঢুকিয়ে ফেলে এবং বের হয়ে যায়।গাছপালাগুলো ধূসর। আহা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়! ভাগ্য ভালো যে গানটা রবীন্দ্রনাথ লেখেননি, বেচারা অসাধারণ জাতীয় সংগীত নিয়ে যে ঝামেলায় আছেন, এই গান লিখলে আর উপায় থাকতো?এয়ারপোর্টে ঢুকতে ঘন্টাখানেক লাগল। সব গাড়ি একটার ওপর আরেকটা, মনে হলো ঠেলাগাড়িও দেখলাম। এয়ারপোর্টে বসে আছি, একটু পরে প্লেন ছাড়বে। শুরু হলো ফ্ল্যাশব্যাক—এই কয়দিনে কত মানুষ আমাকে দেখতে এলো। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এভাবে মানুষ আসে? খোঁজ করে? খাই না কেন, নামাজ পড়ছি না কেন—মায়ের এই মধুর বকা অন্য কোনো দেশে চিন্তা করা যায়? আমার ছোট ভাইয়ের বাচ্চারা সারাদিন আমার গায়ে ঝুলে থাকল, গান শোনাল, নাচ দেখাল। তাশফিক, নর্থ সাউথে পড়ে, আমার জন্য কফির পর কফি অর্ডার। ছোট ভাই, বড় ভাই, ছোট ভাবি, বড় ভাবি—গভীর ভালোবাসায় ঘেরা চারপাশ। আমাদের ড্রাইভাররা, কোথায় যাব, দিন না রাত, না নেই। বসুন্ধরা সিটি, কত মানুষ হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রিকশায় উঠলাম একদিন, আর কোথায় পাবো রিকশা? কোথায় পাবো রিকশাওয়ালা ভাইদের? কোন দেশের বাদাম ফুচকা, সিঙ্গারা আর BFC এত মজা? বৃষ্টি হলে টিনের চালে ঝমঝম শব্দ পৃথিবীর কোথায় শোনা যায়? নোয়াখালীর ডাব তো ফ্লোরিডার ডাবের চেয়েও অনেক মজা । কত রংবেরঙের মানুষ, ২০ কোটি মানুষ, ১৯ কোটি তার অসাধারণ। ২-১টা ঘটনা আমরা অনেক বড় করে দেখি, কিন্তু বাকি ১৯ কোটি মানুষের মাঝে যে গভীর ভালোবাসা, সেটা কি ইংল্যান্ড বা কানাডায় আছে?বিমানে ওঠার আগে আমার স্টুডেন্ট জাকারিয়া আমাকে ফোন করলো, “স্যার, খবর দিলেন না, চুপচাপ চলে গেলেন, মনে বড় কষ্ট পেলাম।” বরিশাইল্লা বন্ধু রিমন ফোন করে নোয়াখাইল্লা ভাষায় গালি দিল, কেন আমি দেখা করি নাই। আমি তাকে বিখ্যাত গানটা এডিট করে শুনিয়ে দিলাম, “বরিশাইল্লা গরু চোর বেড়া ভাইঙ্গা দিছে দৌড়,” আমার খুবই প্রিয় বন্ধু। গলা ভাঙা। আমার ড্রাইভার ফোন করল, কিন্তু কান্নার জন্য কথা বলতে পারল না।গভীর রাতে প্লেনে ওঠার মুহূর্তে, বড় ভাইয়া তানভীর হোসেন যখন ফোন করে জিজ্ঞেস করল সব ঠিকঠাক মতো শেষ হয়েছে কি না, আবার কবে আসব, অনেক অনেক মিস করবে —তখন আমার আবার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানটি মনে পড়লো:

‘ভায়ের মায়ের এত স্নেহ,
কোথায় গেলে পাবে কেহ
ওমা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি
আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত