বুধবার, মার্চ ৪, ২০২৬

রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি বাংলাদেশ ব্যাংক গোপন রাখে দূই মন্ত্রী হোতাদের ‘রক্ষাকবচ’

আপডেট:

দুই মন্ত্রী ছিলেন রিজার্ভ চুরির হোতাদের ‘রক্ষাকবচ’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। আর্থিক খাতে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই সাইবার চুরির ঘটনা তাৎক্ষণিক ধামাচাপা দিয়ে রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় এক মাস পর রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। রিজার্ভের অর্থ চুরির ঠিক ৩৯ দিন পর ঢাকার মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয়। মামলার এজাহারে যেসব অভিযোগ করা হয়, তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তপশিলভুক্ত অপরাধ। দুদকের তপশিলভুক্ত অপরাধ অন্য কোনো সংস্থার তদন্ত করার এখতিয়ার না থাকলেও আইনবহির্ভূতভাবে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। তদন্ত করতে গিয়ে সংস্থাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানসহ অন্তত ১৩ জন কর্মকর্তাকে মূলহোতা হিসেবে শনাক্তও করে। তবে এই মূলহোতাদের নাম মামলার অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিতে সিআইডিকে তখন চাপ দিয়েছিলেন তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো কালবেলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট সিস্টেমে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নিউইয়র্কে (ফেড) রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেওয়া হয় ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকে। পরে ওই অর্থ স্থানীয় মুদ্রা পেসোর আকারে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোয়। এর মধ্যে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে ফিলিপাইন সরকার বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দিয়েছে। বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আর পাওয়া যায়নি।বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আর পাওয়া যায়নি।
রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি বাংলাদেশ ব্যাংক পরদিনই জানতে পারলেও তা গোপন রাখে এবং ৩৩তম দিনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে জানায়। ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অর্থ রূপান্তর, চুরি, আত্মসাৎ—এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা বা প্ররোচনা, জালিয়াতি (আরসিবিসির বিরুদ্ধে), জালিয়াতিতে সহায়তা বা প্ররোচনাসহ বেশকিছু অভিযোগ আনা হয়। এরপর ওই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিআইডির তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানসহ অন্তত ১৩ কর্মকর্তার গাফিলতি ও যোগসাজশের বিষয়টি উঠে আসে। ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যেই ফিলিপাইন, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে জড়িত অপরাধীদের নিয়ে তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ হাতে পায় সিআইডি। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাসহ জড়িতদের আসামি করে অভিযোগপত্র তৈরি করে সিআইডি। তবে সেই অভিযোগপত্র দীর্ঘ পাঁচ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি।ওই সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ চুরির মামলাটি নিয়ে সিআইডি কার্যক্রম শুরু করলে তদন্ত প্রতিবেদন পাল্টে দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরসহ ওই ১৩ কর্মকর্তা তৎপর হন। এরপর তাদের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিতে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সিআইডিকে চাপ দেন। বিষয়টি নিয়ে সাবেক এ দুই মন্ত্রী তখন সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেন। তবে মূলহোতাদের নাম বাদ দিতে তখন রাজি হননি সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা। এমনই এক বৈঠক থেকে তদন্ত কর্মকর্তাদের ধমক দিয়ে বেরও করে দিয়েছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর মামলার গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রতিবেদন আইনবহির্ভূতভাবে নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তাদের হাতে। যে কারণে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার প্রায় চার বছর পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার নাম আসে তাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান, একজন নির্বাহী পরিচালক, একজন মহাব্যবস্থাপক, তিনজন উপপরিচালক, চারজন যুগ্ম পরিচালক এবং উপমহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের তিনজন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে দুজন এরই মধ্যে অবসরে গেছেন। কয়েকজন পদোন্নতি পেয়ে ডেপুটি গভর্নর পর্যন্ত হয়েছেন।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঠিক ৩৮ দিন আগে রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিলিপাইনের পরামর্শক এডিসন জভেল্লানোস মরদেহ পাওয়া যায় ম্যানিলার একটি সড়কে। তবে সে সময় বিষয়টিকে ফিলিপাইনি কোম্পানি বাংলাদেশ ব্যাংকে অবহিত করলেও সেটি প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে সেটিকে ‘টপ সিক্রেট’ ক্যাটাগরিতে ফেলে প্রকাশ না করার দায় সারেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তারা।মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা রিজার্ভ চুরির সঙ্গে যেসব বিদেশি নাগরিককে সন্দেহ করছেন তাদের মধ্যে এডিসন জভেল্লানোস অন্যতম। কেন্দ্রীয় বাংক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় ইআরপি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০০৯ সালের এপ্রিলে স্পেনের ইন্দ্রা সিস্টেমাসের সঙ্গে চুক্তি হয়। একই প্রকল্পের আওতায় ডেটা ওয়্যারহাউস স্থাপনের জন্য চুক্তি হয় ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে। ইন্দ্রা সিস্টেমাসের সঙ্গে চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়ন করে ফিলিপাইনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্দ্রা ফিলিপাইন। ইআরপি ও ডেটা ওয়্যারহাউস বাস্তবায়নে বাংলাদেশ থেকে মানবসম্পদ সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে ইন্দ্রা ফিলিপাইন। তবে অ্যাগ্রিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ওই কর্মীদের পরে নিজস্ব কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয় ইন্দ্রা ফিলিপাইন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকালে ফিলিপাইনের তিন নাগরিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করেছেন। এর মধ্যে প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে ছিলেন এডিসন জভেল্লানোস।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত