হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ভারতের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়, বরং দেশের সঙ্গে। নরেন্দ্র মোদির কাছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য দেয়া অনুরোধের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান, যা ভারতের সরকারের কাছে এখনো মূলতবি রয়েছে।আজ শুক্রবার (৪ এপ্রিল) বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার ভারতের প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিয়ে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য উল্লেখ করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ এক বৈঠকে মিলিত হন। এটি ছিল এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো দুই নেতার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।দক্ষিণ এশিয়ার এ দুই দেশের নেতারা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশে সাক্ষাৎ করেন। তাদের ৪০ মিনিটের এ বৈঠক ছিল আন্তরিক, ফলপ্রসূ এবং গঠনমূলক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শংকর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ভারতকে অত্যন্ত মূল্যবান বন্ধু মনে করে বলেন অধ্যাপক ইউনুস। তিনি বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি আমাদের অভিন্ন ইতিহাস, ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালে আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ভারতের সরকার ও জনগণের অবিচল সমর্থনের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।যদিও এটি ছিল দুই প্রধান নেতার প্রথম সরাসরি বৈঠক, ড. ইউনূস উল্লেখ করেন যে গত আট মাস ধরে দুই দেশ বহু দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে।দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চাই যাতে আমাদের সম্পর্ক সঠিক পথে পরিচালিত হয় এবং উভয় দেশের জনগণ এর সুফল ভোগ করতে পারে।বিমসটেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূস বিমসটেকের সাতটি সদস্য দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য ভারতের সমর্থন কামনা করেন।তিনি গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন ও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য আলোচনা শুরুর আহ্বান জানান।ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দিল্লি সর্বদা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখে। তিনি বলেন, দুই দেশের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং এটি বাংলাদেশের জন্মকাল থেকেই বিদ্যমান।প্রধানমন্ত্রী মোদি ড. ইউনূসের বৈশ্বিক মর্যাদার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন যে ভারত সর্বদা একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশকে সমর্থন করবে।তিনি আরো বলেন, ভারত বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না। আমাদের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে জনগণের, বলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।ড. ইউনূস বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য দেয়া অনুরোধের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান, যা ভারতের সরকারের কাছে এখনো মূলতবি রয়েছে।তিনি উল্লেখ করেন যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উস্কানিমূলক মন্তব্য করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন, যা ভারতের আতিথেয়তার অপব্যবহার বলে মনে হচ্ছে।
তিনি ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা এবং উস্কানিমূলক অভিযোগ করে চলেছেন, বলেন অধ্যাপক ইউনুস।
আমরা ভারতের সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই যেন তিনি আপনার দেশে অবস্থান করার সময় এমন উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকেন।
অধ্যাপক ইউনুস জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার (ওএইচসিএইচআর) তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করেন, যেখানে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সমর্থিত সশস্ত্র কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু।প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও অমানবিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ভারতের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়, বরং দেশের সঙ্গে।ড. ইউনূস সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গেও আলোচনা করেন এবং বলেন, সীমান্তে প্রাণহানি কমানোর জন্য একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।প্রতিবার সীমান্তে হত্যা হলে আমি গভীর বেদনা অনুভব করি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা তিনি ভারতের প্রতি অনুরোধ জানান যেন এ হত্যাকাণ্ড রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কেবল আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায় এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলো মূলত ভারতের ভূখণ্ডে ঘটে। দুই নেতা এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।ড. ইউনুস বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন এবং বলেন, তিনি এ সংস্থার কার্যক্রম আরো দৃশ্যমান করতে চান এবং এটি যেন দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের স্বপ্ন পূরণের একটি কার্যকর প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা অনেকাংশে অতিরঞ্জিত এবং অধিকাংশই ভুয়া খবর। তিনি ভারতীয় নেতাকে পরামর্শ দেন যে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যেন এ ঘটনাগুলো সরেজমিনে যাচাই করে দেখে।প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, তিনি ধর্মীয় ও লিঙ্গ সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার ওপর নজরদারির জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু করেছেন এবং তার সরকার এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
দুই নেতা তাদের উন্মুক্ত ও ফলপ্রসূ আলোচনার সমাপ্তি টানেন পরস্পরের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ কামনার মাধ্যমে এবং উভয় দেশের জনগণের শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
মোদীর সাথে ডঃ ইউনুস বৈঠক শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে প্রধান উপদেষ্টা
আপডেট:

