যে যায় কানাডা ২ – অক্টপাস (ভূমিকা)
ইফতেখার হোসেন
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষক ছিলাম। অর্থনীতি বিভাগে। NSU তেও পড়াতাম। অনেক মজার সময়, ভুলে যাবার সুযোগ নাই। শিক্ষক হিসাবে প্রথম কয়েক বছর ছাত্র ছাত্রীদের কাছে ছিলাম ভাইয়ার মত। পরের কয়েক বছর কড়া, মিলিটারি শিক্ষক (ছাত্র ছাত্রীরা বলতো)। আমার জন্য সময়টা ছিল স্বপ্নের। অসাধারণ সব শিক্ষক, পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের কম্বিনেশন, সাথে কিছু আলাদিনের দৈত্য টাইপ মানুষ। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ছিল, নটরডেম, মাদ্রাসা, ভিকারুননিসা, জোবায়দা মহিলা কলেজ ছিল, ভয়ংকর রিচ ফ্যামিলির student ছিল, রিকশা চালিয়ে পড়ার খরচ চালাতো এমন student ছিল, সেলিবৃটি ছিল, আবার আমার মত লেবেন্ডিসও ছিল। কিন্তু কোনোদিন কোনো শিক্ষককে কোনো ছাত্র ছাত্রী অসম্মান করেনি। অনেক সুন্দর একটা পরিবেশ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবোনা কখনো ভাবি নাই। আমার সাথে নিশাত শায়লার বিয়ের সময় নিশাতের বাবা মায়ের ধারণা ছিল পৃথিবী উল্টে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অন্তত তাদের একমাত্র পেয়ারী কন্যাকে নিয়ে দেশের বাইরে সেটেল্ড হবেনা (আমার খবর আছে)। কিন্তু সেই আমি কিনা এখন কানাডা নামের অক্টপাসের পেটে। কিভাবে বাংলাদেশের কিছু মানুষকে অক্টপাস কানাডা আস্তে আস্তে গিলে ফেলে সেই ধারণা দেয়ার জন্য এই কঠিন লেখা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় প্রতিদিন সকাল সকাল অফিসে যেতাম। এতসব অসাধারন ছাত্র ছাত্রী ছিল চারপাশে। একদিন না আসলে খারাপ লাগতো। এক ছাত্রী একদিন এসে ফরিদ স্যারের কাছে বললো তার মা বাসায় কাজ করে তার বেতন দেয়। সেই মাসে মা বেতন পায় নাই। কিভাবে পরীক্ষার ফিস দিবে বুঝতে পারছে না। আমি ছিলাম স্যারের রুমে। স্যারের চোখে পানি। সেদিনই ফরিদ স্যারের সাথে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এ গেলাম। খুব দ্রুত গভর্নর স্কলারশীপ চালু হলো। আমাদের একজন শিক্ষক বৃত্তি ফান্ডে এক কোটি টাকা দিলেন। স্যারদের সাথে আমরা বৃত্তির টাকা জোগাড় করতে কত জায়গায় গিয়ে বসে ছিলাম। আজকে বিভাগের বৃত্তির ফান্ডে অনেক টাকা। সেই টাকায় আমাদের অনেক মেধাবী ছেলে মেয়ে পড়ালেখা শেষ করে বিশ্বের বড়বড় জায়গায়। সেই ছাত্রীও আছে ভালো জায়গায়। এই রকম কত ঘটনা। কত কিছু করার সুযোগ। কোথায় আছে বাংলাদেশ ছাড়া?
আমি আমার রুমে এসে বসা মাত্র চলে আসত দুইজন আলাদিনের দৈত্য – লাবু ভাই আর দাইয়ুম ভাই। কি লাগবে, চা, জুস্, সিঙ্গারা, বার্গার, পাসপোর্ট, পেপার, বই, গাড়ির ফিটনেস, রাজউকের কাগজ,, টিভি, চুই ঝাল , পুরান ঢাকার বাখরখানি … বাংলাদেশের যেখান থেকে সম্ভব নিয়ে আসতো তারা। আনতোই আনতো। আমরা বসে রুমে। আলাদিনের দৈত্য নিয়ে আসতো সব। জাস্ট এক্সাম্পল, কেমন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের জীবন।ছাত্র ছাত্রীরা ছিল মজার। NSUতে এক গ্রূপের ছাত্র ছাত্রীরা হঠাৎ আমাকে খুব বেশি বেশি জিনিয়াস জিনিয়াস বলা শুরু করলো। আমি মনে মনে খুশি হলেও চিন্তায় পড়লাম হঠাৎ আমাকে এত জিনিয়াস বলার কারন কি। পরে জানতে পারলাম সেই গ্রূপে জিনিয়া নামের একজন আছে। জাস্ট ফর ফান। সেই গ্রূপ আর এইরকম কত মজার মজার গ্রূপ ছিল। মজার, ফানি, মেধাবী, কিন্তু অনেক রেস্পেক্টফুল। ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে একবার দিল্লিতে কনফারেন্স যাওয়ার আগে আমরা সবাই মিলে হিন্দি গান তুম পাস্ আয়ে, তুঝে দেখা তুয়ে জানা সনম, … প্র্যাক্টিস করলাম । যেন কম খরচে তাজমহল দেখতে পারি। এখনো কি আছে এমন? জানিনা।মাদ্রাসা থেকে আসা একজন ছাত্র, ক্যালকুলাস এর ভয়ে ইকোনমিক্স ছেড়ে পালায় পালায়, তার কি দোষ ? সেই ছেলে আলফা চিয়াং এর অ্যাডভান্সড ম্যাথ বই শেষে করে ফেললো। এখন USA তে ম্যাথমেটিক্যাল ইকোনোমিক্স পড়ায়। আমার এক প্রিয় student কে পড়ালেখা ঠিকমতো না করায় একবার বকা দিলাম। সে খুব কষ্ট পেল আর ভাবলো আমি তাকে বুলি করছি। আমার উপর রাগ হয়ে পড়ালেখা করে সে আমার চেয়ে ভালো পজিশনে গিয়ে একটা ইমেইল পাঠায়। স্যার আপনার বুলির জবাব সেদিন দেই নাই। প্রতিজ্ঞা ছিল আপনার চেয়ে ভালো পজিশনে গিয়ে তারপর আপনাকে জানাবো – স্যার, কখনো কাউকে বুলি করবেননা। আমি সেদিন জানলাম যে আমি বুলি করেছিলাম। কিন্তু সে যে তার মেধার ব্যবহার করে আমার চেয়ে ভালো পজিশনে গেছে , এই আনন্দের ঘটনা গুলি পৃথিবীর আর কোথাও ঘটে? বাংলাদেশেই ঘটে।বাংলাদেশে যতদিন ছিলাম, ছাত্র ছাত্রীরা, আশেপাশের সবাই আমাদের মাথায় তুলে রেখেছিল। পৃথিবীর আর কোথাও এত সম্মান নেই, এত আনন্দ নেই, job satisfaction নাই।কানাডা আসলাম ২০১৬ সালে। ২০২১ পর্যন্ত স্বপ্নেও ভাবি নাই কানাডায় থেকে যাব। আমার ঢাবি , আমার NSU , আমার প্রিয় ছাত্র ছাত্রী, আমার ফ্যামিলি , আমার চারপাশের সবাই। কিন্তু কানাডা অক্টপাসের মতো আস্তে আস্তে আমাকে গিলে ফেলল। আরো অনেককে গিলে ফেলে। টের পাওয়া যায়না। অক্টপাস কিভাবে আমাদেরকে গিলে ফেললো সেটা লেখার জন্য এতো বড় ভূমিকা। আজকে ভূমিকা পর্যন্ত থাক। 🤔 অক্টপাসের মূল ঘটনা পরে লিখবো। লেখালেখি থেকে খানিক বিরতি। বসে বসে বাংলাদেশের রাজনীতির yoyo খেলা দেখবো। দূরে থাকলেও বাংলাদেশই আমাদের দেশ। আমাদের খুব প্রিয় মানুষরা বাংলাদেশেই থাকে। যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত – আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি । 😊


