সোমবার, মার্চ ২৩, ২০২৬

বাংলাদেশ–রাশিয়া শ্রমবাজার সহযোগিতা: নীতি, সুযোগ ও বাস্তবতা

আপডেট:

রাশিয়া বর্তমানে এক অভূতপূর্ব শ্রম সংকটের মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি, দেশটির জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং অভ্যন্তরীণ শ্রমশক্তির ঘাটতি একসাথে মিলিত হয়ে শ্রমবাজারে তীব্র সংকট তৈরি করেছে। রাশিয়ান শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে দেশটিতে অন্তত তিন থেকে চার মিলিয়ন বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। বিশেষত নির্মাণ, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সেবা খাতে এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমের ফলে এই চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি শ্রমশক্তি–সমৃদ্ধ দেশ। প্রতিবছর প্রায় ২৩ লাখ নতুন শ্রমিক কর্মবাজারে প্রবেশ করছে, যার মধ্যে প্রায় দশ লাখ শ্রমিক বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যায়। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অন্যতম ভিত্তি—২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৩০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে। তবে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনো মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বাজার বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা জরুরি হয়ে পড়েছে, আর সেই জায়গায় রাশিয়া একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হিসেবে সামনে আসছে।রাশিয়ার শ্রমবাজারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিযোগিতামূলক মজুরি কাঠামো। নির্মাণ ও শিল্পখাতে এখানে গড় বেতন মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শ্রমিকদের গড় মজুরি প্রায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য রাশিয়া একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। একইসাথে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বৈচিত্র্যময় হবে, যা একক অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে।তবে এই সুযোগকে বাস্তব রূপ দিতে হলে কিছু মৌলিক নীতি ও কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিক সমঝোতা প্রয়োজন। মজুরি, কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলোকে চুক্তির আওতায় আনতে হবে। এর ফলে শ্রমিকরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিরাপদে কাজ করতে পারবেন এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভাষা প্রশিক্ষণ একটি অপরিহার্য শর্ত। রাশিয়ার শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে শ্রমিকদের অন্তত প্রাথমিক রাশিয়ান ভাষা জানা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্মাণ, ওয়েল্ডিং, কৃষি বা শিল্প উৎপাদন—যে খাতেই পাঠানো হোক, তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই প্রশিক্ষণ বাংলাদেশেই বাধ্যতামূলকভাবে সম্পন্ন করা উচিত।তৃতীয়ত, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দালালচক্র ও অবৈধ খরচ বন্ধ না করলে শ্রমিকদের ভোগান্তি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চুক্তি, তথ্য যাচাই ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে রাশিয়ার প্রধান শহরগুলোতে শ্রমিক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যেখানে তারা আইনি পরামর্শ, স্বাস্থ্যসেবা তথ্য এবং জরুরি সহায়তা পাবেন।বাংলাদেশের জন্য এর সম্ভাব্য সুফল বিশাল। যদি ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক রাশিয়ায় প্রেরণ করা যায়, তাহলে প্রতিবছর এক থেকে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত রেমিট্যান্স আয় সম্ভব। এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসাথে শ্রমিকরা দেশে ফিরে আরও দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পখাতের জন্যও উপকারী। অন্যদিকে রাশিয়াও লাভবান হবে নিয়মিত ও সাশ্রয়ী শ্রমশক্তি পেয়ে। তাদের শিল্প উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল শ্রম সরবরাহ নিশ্চিত হবে।এই সহযোগিতাকে টেকসই করতে হলে একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। প্রথম ধাপে ২০২৫ সালে পাইলট প্রকল্পের আওতায় বিশ হাজার শ্রমিক প্রেরণ করা যেতে পারে। এর সফলতা মূল্যায়ন করে পরবর্তী দুই বছরে সংখ্যা বাড়িয়ে পঞ্চাশ হাজারে উন্নীত করা সম্ভব। অবশেষে ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক পাঠানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে একটি স্থায়ী শ্রম রপ্তানি কাঠামো তৈরি হবে।সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার শ্রমবাজার সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। রাশিয়ার শ্রম সংকট এবং বাংলাদেশের তরুণ শ্রমশক্তি একসাথে মিলে একটি টেকসই সমাধান দিতে সক্ষম। তবে এর জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি চুক্তি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ কাঠামো। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে রাশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে এবং দেশের রেমিট্যান্স আয় ও শ্রম রপ্তানি নীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত