বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৬, ২০২৬

সহস্রাধিক শিক্ষকের মানবেতর জীবন

আপডেট:

এক বছর বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন এমপিওভুক্ত অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষকসহ সহস্রাধিক সহকারী শিক্ষক। তাদের নাম ইলেকট্রিক ফান্ড ট্রান্সফারে (ইএফটি) অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বেতন চালু রাখতে তিন দফা নির্দেশনা দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। কিন্তু সেই নির্দেশ মানেননি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধানরা।এ ব্যাপারে কার্যকারী পদক্ষেপ এবং স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে পদ-বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক জোট। স্মারকলিপিতে তিন জন অধ্যক্ষ ও তিন প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, হেনস্তার শিকার হওয়া সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষকের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এ পর্যন্ত ছয় জন মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক শিক্ষক আহত ও অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিত্সায় মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন। আর্থিক সংকটে পড়ে অনেকের সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এক বছর ধরে বেতন বন্ধ থাকায় জীবন অতিবাহিত হচ্ছে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে। পরিবারবর্গের আশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। নিজের জীবনের কথা নাই ধরলাম, কিন্তু পরিবারে বাবা, মা, ভাইবোন এবং স্ত্রী সন্তান-তাদের মুখে দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজ কিছু শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা পদত্যাগ করতে বাধ্য করলে এই সুযোগ নেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ সন্ধানী শিক্ষকরাই। শিক্ষার্থীদের দিয়ে স্কুল-কলেজের প্রধানসহ সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনা বন্ধ করতে নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পদত্যাগের শিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান এবং সহকারী শিক্ষকরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যয়বিচার দাবিতে রাজপথে আন্দোলনও করেছেন গত ১৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ জোর করে পদত্যাগ করানো শিক্ষকদের বেতন অব্যাহত রাখার নির্দেশনা জারি করে। অফিস আদেশে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ ও হেনস্তা ও বেতন-ভাতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তে বলা হয়, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও এর পেছনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিষয়ে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু থাকবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আরো দুই দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ২ হাজার ৪৫০ শিক্ষকের ইএফটিতে নাম অন্তর্ভুক্তি করা হয়। তবে ১ হাজারের বেশি শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে এক বছর ধরে, কারণ তাদের নাম ইএফটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

পদ-বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক জোটের আহ্বায়ক ও ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, তিনি নিজেসহ সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক এক বছর কর্মস্থলে যেতে পারেননি। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা অধিকাংশ শিক্ষকের নিয়োগ হয়েছে বিএনপি সরকারের আমলে। তারা কখনো কোনো রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার পরও তাদের আওয়ামী লীগের দোসর ট্যাগ দিয়ে কর্মস্থলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, শিশুদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে সততা, নিষ্ঠা ও নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে স্বার্থলোভী লোকদের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছি আমরা। তারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে, দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, যা অস্বাভাবিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত