মঙ্গলবার, মার্চ ৩১, ২০২৬

ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র ফ্রান্সের রাজনীতি সংকট বাড়ছে

আপডেট:

সম্পাদকীয়

বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম বড় পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় ইউরোপের শিল্পোন্নত ও পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ফ্রান্সকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত (রাশিয়া-ইউক্রেন) নিরসনে অগ্রগামী ভূমিকায় দেখা গেছে দেশটিকে। এমনকি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল সংকটের (গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন) ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। তবে বৈশ্বিক সংকট সমাধানে তৎপর থাকা ইউরোপীয় দেশটি এবার নিজেরাই অভ্যন্তরীণ সংকটে পর্যুদস্ত। গত সোমবার ফরাসি আইনপ্রণেতারা ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরুকে পদচ্যুত করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর ফলে দেশটি নতুন রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময় সরকারহীন অবস্থার মুখে পড়েছে।বাইরু ৪৪ বিলিয়ন ইউরো (৫১ বিলিয়ন ডলার) সঞ্চয় পরিকল্পনা অনুমোদনের চেষ্টা করতেই নিজেই এই ভোট ডাকেন। ওই পরিকল্পনায় দুটি সরকারি ছুটি বাতিল এবং সরকারি ব্যয় স্থগিত রাখার প্রস্তাব ছিল, যা অনেকটাই অগ্রহণযোগ্য ছিল। শেষ পর্যন্ত ৩৬৪ জন এমপি বাইরুর বিপক্ষে ভোট দেন এবং ১৯৪ জন তার পক্ষে ভোট দেন। বাইরুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে ২৮০ ভোটের প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পাওয়ায় তার সরকারের পতন হয়েছে। ফলে মাত্র নয় মাস দায়িত্ব পালনের পর প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরুকে এখন পদত্যাগ করতে হবে। এর মাধ্যমে তিনি তার পূর্বসূরি মিশেল বার্নিয়ের পথেই হাঁটলেন, যিনি গত ডিসেম্বর অনাস্থা ভোটে হেরে পদচ্যুত হয়েছিলেন। এলিসি প্রাসাদের বরাতে জানা গেছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। তবে বাইরুর পদত্যাগ মাখোঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে, কারণ তার সামনে গ্রহণযোগ্য বিকল্প প্রার্থীর সংখ্যা খুবই সীমিত। রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ফরাসি সরকারি বন্ডের আয় বা বিনিয়োগকারীদের চাওয়া সুদের হার এখন স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসের বন্ডের চেয়েও বেশি; যদিও এক সময় এই দেশগুলোই ছিল ইউরোজোন ঋণ সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। আগামী শুক্রবার ফ্রান্সের সার্বভৌম ঋণমান পর্যালোচনায় সম্ভাব্য অবনমন দেশটির ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অবস্থানে আরও বড় আঘাত হানতে পারে।গত সোমবারের ভোটের আগে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বাইরু বলেন, আপনারা সরকারের পতন ঘটানোর ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু বাস্তবতাকে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। বাস্তবতা কঠোরভাবেই থেকে যাবে; ব্যয় বাড়তেই থাকবে, আর ঋণের বোঝাযা ইতিমধ্যেই অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছেআরও ভারি ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। বাইরু স্বীকার করেন যে তারা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে করা সামাজিক চুক্তি ভেঙে ফেলেছেন। ফ্রান্সের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সূত্রপাত প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর গত বছরের নাটকীয় সিদ্ধান্তে। ২০২৪ সালের মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালির চমকপ্রদ ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে মাখোঁ আকস্মিক নির্বাচনের ডাক দেন। তবে সেই সিদ্ধান্ত উল্টো ফল বয়ে আনে। নির্বাচনে মাখোঁর দল ডানপন্থি ও বামপন্থি উভয় শক্তির কাছে আসন হারায়, ফলে ফ্রান্স এক বিভক্ত ও অস্থিতিশীল সংসদ পায় প্রধানমন্ত্রীকেও সমানভাবে কঠিন বাজেট যুদ্ধের মুখে পড়তে হবে। সোশ্যালিস্ট পার্টি ধনীদের ওপর কর বাড়াতে এবং মাখোঁর ব্যবসায়ীদের জন্য দেওয়া করছাড় বাতিল করতে চায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা দল ও আকস্মিক নির্বাচনের পর গড়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘লে রিপাবলিকান’ এসব প্রস্তাব একেবারেই মানতে রাজি নয়। এর ফলে ফ্রান্সের আর্থিক জট শিগগিরই মিটবে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। যদি আবার আকস্মিক সংসদ নির্বাচন হয়, সাম্প্রতিক এলাবে জরিপে দেখা গেছে ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালি সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, বামপন্থিরা দ্বিতীয় স্থানে থাকবে আর মাখোঁর মধ্যমপন্থি জোট থাকবে অনেক পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে। এখন অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, অবশেষে ডানপন্থিরাই ক্ষমতায় আসবেসেটি যদি এখনই নাও হয়, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সে চিত্র বদলাতে পারে। যদিও খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেন, এতে ফ্রান্সের সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান হবে। ফরাসি রাজনীতিবিদদের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ভেঙে পড়েছে এবং ক্ষোভ রাস্তায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বামপন্থিরা আজ বুধবার সারা দেশে ‘ব্লোকঁ তু’ (সবকিছু অবরুদ্ধ করো) স্লোগানে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়নগুলো ১৮ সেপ্টেম্বর আরেক দফা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু ঘটছে একেবারে সবচেয়ে অস্বস্তিকর ভূরাজনৈতিক সময়েযখন ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। প্যারিসের এই অস্থিতিশীলতা রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় সুযোগ, কারণ তারা ইউরোপের দুর্বলতাকে উপহাস করে আনন্দ পান।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত