#রুপালী_নক্ষত্রের_রাত_৪৪_
(পূর্ব প্রকাশিতের পর) আদাবরের এই নতুন বাসাটা খুব নীরব ছিল। এদিকে তখনও বসতি গড়ে ওঠেনি। শ্যামলী লিংক রোডের পর নীচু জমি। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু’চারটা দালান সবে উঠতে শুরু করেছে। আমাদের বাসাটা চারতলা। আশেপাশে কোন বিল্ডিং নেই। চারতলা থেকে পশ্চিমে বহুদূর দেখা যায় ধান ক্ষেত আর পূর্ব দিকে ঢাকা শহর। সূর্যাস্তটা ভীষণ সুন্দর হয়ে ওঠে। মনেহয় যেন ধান ক্ষেতের ভেতর সূর্যটা ঢুকে যাচ্ছে। আমি বিকালে প্রায়ই ছাদে উঠে সূর্যাস্ত দখি। অনেক্ষন তাকিয়ে থাকি। আমার খুব ভাল লাগে ডিমের কুসুমের মত লাল সূর্যটা যখন ডুবে যায় তা দেখতে। বনানীতে বিকালে খেলতাম , বন্ধু বান্ধব ছিল। এখানে কাউকে চিনিনা। বন্ধু বান্ধব নেই। বনানীর জন্য বুকটা হুহু করে। আম্মার জন্য মামুনের জন্য , মামুনের আম্মার জন্য , সেলিম , অক্ষয় স্যার আরো কতজন আমার জামার এই ছোট্ট বুক পকেটে হৃদপিণ্ডের সাথে ধুক ধুক করে , আমি যখন সূর্যটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
মাঝে মাঝে শান্তাকে নিয়ে ছাদে আসি। সে আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। সেও আমার মত শিশুকালে শান্ত ছিল। রিং রোডের শেষ মাথায় শিয়া মসজিদের কাছে একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুল ছিল সেসময়ে। নামটা এখন আর মনে নেই। শান্তাকে সেখানে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিল। আমার কাজ ছিল সকালে তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। দুপুরে ছুটি হলে নিয়ে আসা। আমি খুব উৎসাহ নিয়ে কাজটা করি। আমার খুব ভাল লাগে যখন শান্তা আমার হাত ধরে হাঁটে। আমি একহাতে ওর ব্যাগটা নেই। আমরা প্রয়ই কোন কথা বলিনা। মাঝে মাঝে শুধু ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। মনেহয় এভাবেই যদি জীবনটা পার হয়ে যেত।
একদিন দুপুরে স্কুলে যেতে দেরী হয়েছিল। আমি দ্রুত হাঁটছিলাম। স্কুলে গিয়ে দেখি সব খালি , কেউ কোথাও নেই। আমি ভয় পেলাম। শান্তা কোথায় ? গেটের ভেতর ঝাড়ু দিচ্ছিল এক লোক। তাকে জিজ্ঞেস করলাম। সে মহা বিরক্ত হয়ে আমরা দিকে তাকিয়ে বলল , আপকে বহিন ত মেয় কেয়া কারু ? বলেই সে আবার ঝাড়ু দেয়া শুরু করল। আমি এবার আতংকিত। কারন তার কথা আমি বুঝিনি। আমি সোজা প্রিন্সিপালের রুমের দিকে গেলাম। সেখানে সুন্দরী এক মহিলা প্রিন্সিপালের চেয়ারে চা খাচ্ছিলেন। আমি বললাম তাকে আমার বোনের কথা। আশ্চর্য তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। আমাকে বললেন , চলো দেখি।
আমরা দোতলায় উঠলাম। প্রথম কক্ষটিই ওদের ক্লাস। দেখলাম শান্তা ক্লাসের এককোনে বসে আপন মনে ছবি আঁকছে। মেডাম বললেন , এটিই কি তোমার বোন ? আমি কিছু বলতে পারলামনা। শান্তা মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল। যেন বলল , ভাইয়া এসেছ ? মেডাম তার উত্তর পেয়ে গেলেন। তিনি আবার বললেন , তোমার বোনটা অন্য রকম। ও খুব শান্ত আর ভদ্র। কখনও ক্লাসে হট্টগোল করেনা। সবসময় চুপচাপ থাকে। অন্য বাচ্চাদের মত নয়। ও কি বাসাতেও এরকম ? আমি বললাম , জি মেম বাসাতেও ও শান্তশিষ্ট। মেডাম বললেন , চলো তোমাদের এগিয়ে দেই। তিনি আমাদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আমি শান্তার ব্যাগটা একহাতে নিয়ে আরেক হাতে ওর হাতটা ধরি। মেডামকে বলি , থ্যাংক উই মেম …। তিনি বললেন , ইউ আর ওয়েলকাম , বয়।
রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে আমি শান্তাকে বললাম , সরি আপু আজকে দেরী হয়ে গেল। শান্তা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিছু বললনা। যেন বলতে চেয়েছিল , থাক কিছু হবেনা। আমিত ছবি আঁকছিলাম। এমনই ছিল শান্তা আর আমার ভাই বোনের এক সুতোয় গাঁথা সম্পর্ক। বিকালে ছাদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সূর্যাস্ত দেখতাম তখনও শান্তা আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। আজ আমার মনে হয় ছয় বছর বয়সে আমি যেভাবে চিন্তা করতে শিখেছিলাম , যে আবেগ অনুভুতি আমার ভেতর কাজ করত , শান্তারও ঠিক সেরকম আবেগ অনুভুতি ছিল। কেউ কখনও বুঝবেনা যে আমাদের মা ভিন্ন ছিল যদি আমরা না বলি কাউকে।
আদাবরে আসার পর শ্যামলকে খুব মনে পড়ত। বুকটা টন টন করত ওর জন্য। কিন্তু মা’কে জিজ্ঞেস করতে ভয় হত ওর কথা। কারন এটা নিয়ে আবার অশান্তি সৃস্টি হবে৷ শান্তা একদিন বিকালে আমাকে বলল , ভাইয়া তোমার শ্যামল ভাইয়ার জন্য খারাপ লাগছে ? আমি কিছু বলতে পারলামনা। মাথা নাড়লাম। ও বলল , থাক তুমি মন খারাপ কোরনা। শ্যামল ভাইয়া ভাল আছে। আমার চোখ চক চক করে উঠল। আমি সেদিন রাতে মাকে বললাম , মা শ্যামলের স্কুলটা কোথায় ? মা শান্ত স্বরে বললেন , কুমিল্লার ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। সেখানে হোস্টেলে থাকে। বলে তিনি গম্ভীর মুখে চুপ হয়ে গেলেন। তার চেহারা দেখে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হল না। কি কারনে শ্যামলের মত শান্ত ভদ্র মেধাবী একটি ছেলেকে বার বছর বয়সে হোস্টেলে যেতে হল আমাদের মত একটি পরিবার থেকে তা আমার মাথায় ঢুকল না। সে কখনও কোন প্রশ্ন করত না মা’কে। মা যা বলতেন তাই সে বেদ বাক্যের মত মেনে নিত। সে পড়াশোনা ঠিক মত করত। তার চালচলন আচরন ছিল ভদ্রলোকের মত। এত ভাল হওয়া স্বত্বেও সে কেন হোস্টেলে যাবে তা কিছুতেই আমি বুঝতে পারছিলামনা। প্রশ্নটা আমার মনে থেকে গেল।
এর বহু বছর পর প্রশ্নটার জবার আমাদের শান্তাই দিয়েছিল। আমাদের দু’ভাইর কাছ থেকে মা শান্তাকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন। আমাদের প্রতি শান্তার যেন কোন অনুভুতি না থাকে সেজন্য বহু চিন্তা ভাবনা করে মা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শান্তাই হবে আব্বার উত্তরাধিকার। তিনি তাকে বিশেষ কিছু বানাতে চেয়েছিলেন। আমরা যেন সাধারন ভাবে বেড়ে উঠি। কিন্তু শান্তা হবে অসাধারণ কেউ। এই ধারনাকে বাস্তব রুপ দেবার জন্য এটা ছিল তার প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন , আপনি বেইমানি করতে চাইলেও রক্ত বেইমানি করেনা। বংশের ধারা ও গতি , স্বভাব , অভ্যাস , প্রতিভা রক্তের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়। তিনি যা চেয়েছিলেন , তিনি যেজন্য আমাদের তিন ভাই বোনকে আলাদা করে রেখেছিলেন সেটা হয়নি। তিনি এখানে আর জিততে পারেননি। তিনি হেরে গিয়েছিলেন। তিনি যা চেয়েছিলেন তার ইল্টোটি হয়েছিল। আমাদের তিন বোনের সম্পর্ক এত বেশী দৃঢ় হয়েছিল এবং তা এখনও যেভাবে অটুট আছে তা শুধু মা’র জন্য নয় বরং আমাদের পুরো বংশের জন্য একটা দৃষ্টান্ত। (চলবে)
★★★
কাহিনী নয় , জীবনের গল্প

