বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

ধর্ষনের__দর্শক — ওহিদুল আলম পিটু

আপডেট:

#ধর্ষনের__দর্শক

ধর্ষক এখনো হইনি, প্রতিনিয়ত দর্শক তো হচ্ছি । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝাড় তুলছি, চিৎকার করছি, মানববন্ধন করছি, মিছিল আর শ্লোগানে গরম করছি রাজপথ। অতঃপর ক্লান্ত হয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছি। পরের দিন আবার কাজে নিজ প্রতিষ্ঠানে ছুটছি। ভুলে যাই গতকালের ধর্ষণের প্রতিবাদের কথা! আবার একটি ধর্ষণের সংবাদের প্রতীক্ষায় বসে আছি! এভাবে বেঁচে থাকাকে ঘৃণা করি। এভাবে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। যেখান থেকে পারেন, ধর্ষককে ধরে আনুন। তারপর দিনের আলোতে, খোলা মাঠে,জনসমাগমের মধ্যে তাদের ক্রসফায়ারে দিন। এছাড়া আর কোন সমাধান মাথায় আসছে না।

বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যতের কোন ধর্ষক তীব্র নিন্দা জানায় ধর্ষণের। অদ্ভুতুরে এ তামাশা দেখতে-দেখতে নিজের ভেতরই হঠাৎ ধর্ষককে দেখতে পেয়ে চমকে উঠি!

আমরা পুরুষ। আমরাই জনক কিশোরী তরুণী বৃদ্ধা নারীর। সেই আমরাই জনক ধর্ষিতা কিংবা ধর্ষনকারীর, কী অদ্ভুত তাই-না?

বিজ্ঞাপন

আমরা শক্তিশালী হয়ে নারীকে পাহারা দিয়ে থাকি। ছোট্ট সোনামনিদের চুম্বন দিয় ভালোবেসে।যুবতী মেয়েকে শাসনে রাখি। স্ত্রীর সাথে করি মধুময় মিলন। পুরুষ টিকিয়ে রাখছে সভ্যতা,পুরুষ দিচ্ছে নারীকে যৌবনের সুখ, পুরুষ দিচ্ছে যুদ্ধ ও শান্তি।

আবার আমরাই তুলে নিই ধারালো ছুরি, শিশুর যোনিকে করি ক্ষতবিক্ষত! পাহাড়ি বোনকে দলবেঁধে শুনাই হিংস্র গর্জন! আমরাই কেড়েনি নারীর সম্ভ্রাম আর সভ্যতাকে ফেলি হুমকির মুখে।

আমরা পুরুষ শক্তিমান,তাই মর্জিমতো করি যা ইচ্ছে তাই ! মা, স্ত্রী, মেয়ে, বোনের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়া আমরাই হরণ করছি অন্য কারো মা, স্ত্রী, মেয়ে, বোনের নিরাপত্তা। এই তামাশার শেষ কোথায়?

তনু,মিতু, নুসরাত,সেতু মন্ডলের মৃত্যুতে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়! সেই মৃত্যুর মিছিলে আরেকটা নাম যুক্ত হচ্ছে মাগুরার আছিয়া। আট বছরের এই শিশুকে বাবা ও দুই ছেলে মিলে ধর্ষণ করে। আর কতজন ধর্ষিত হলে বিবেক জাগ্রত হবে ? দিন শেষে ধর্ষকরা ঠিকই বেঁচে আছে,নেই শুধু নিষ্পাপ তনু,মিতু, নুসরাতেরা।

পত্রিকায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা ধর্ষণের পর ছোট মেয়েটির লাশ চাপা, চার বছরের শিশুর গোপানঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেঁটে বড় করে ধর্ষণ, চলন্ত গাড়ির মাঝে ধর্ষণ, প্রতিবন্ধী কিংবা পাগলীকে ধর্ষণ, মায়ের সমান বৃদ্ধা মহিলা ও ছাড় পায়নি হায়েনাদের বিকৃত যৌনাচার থেকে,স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ, মাকে বেঁধে রেখে মেয়েকে, মেয়েকে বেধে রেখে মাকে ধর্ষণ। বয়ঃসন্ধির পরের দিনগুলিতে কি পত্রিকায় এসব ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা পড়ে আমার শরীর উত্তেজনায় কাঁপেনি? তখন কি ধর্ষিতার জন্য দুঃখবোধ হতো ?

কিন্তু আমিতো পাষাণ না, রক্তমাংসের মানুষ। অন্যের দুঃখে আমার চোখে পানি আসে, অন্যের ব্যথায় আমার বুকেও চিনচিনে ব্যথার অনুভুতি হয়। তাহলে ধর্ষিতার জন্য আমার দুঃখবোধ না-হয়ে কেন ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা পড়ে আমার শরীর উত্তেজিত হয় ! ভাবি ভাবতে ভাবতে এর উত্তর খুজি। কেন শারীরিক ও মানসিক ভাবে চরম নির্যাতনের শিকার ক্ষত-বিক্ষত মেয়েটির দুঃখে সমব্যথী না-হয়ে উল্টো আমার শরীরে উত্তেজনা দেখা দিতো ! দুঃখ অনুভব না করার যে কারণটা খুঁজে পেলাম সেটা হল মেয়েটা যে একজন মানুষ, সেই বোধটাই আমার ছিল না। গভীর অবচেতনায় অপরিচিত তরুনী মেয়েকে নিখাদ যৌনবস্তু ছাড়া অন্য কোন কিছু আমি ভাবিনি। যে বস্তু ধ্বংস হলে আমার কোন বৈষয়িক ক্ষতি নেই সেই বস্তুর জন্য আমার দুঃখ হবে কেন?

দুর্ভাগ্য হলেও সত্য আমাদের এই সমাজে বয়ঃসন্ধির পারে একজন উড়তি তরুনের কাছে প্রকৃতির নিয়মে কিংবা হরমোনের প্রভাবে মা-বোন সম্পর্কিত ছাড়া নারী মানেই আদ্যোপান্ত যৌনবস্তু। তারুণ্যের মনে মেয়ে মানেই ভোগ্যপণ্য। নারীর যে সুখ দুঃখ, হাসি কান্না, মান-অভিমান, ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকতে পারে তা পুরুষদের কল্পনার বাহিরে। কৈশোরে নারীকে যৌনবস্তু ভেবে এই সমাজ-সংস্কৃতিতে বেড়েওঠা পুরুষেরা সময়ও সুযোগমত ভোগ্যপণ্য কিংবা যৌনবস্তর উপর হামলে পড়বে, এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

নারীর শরীর দেখে পুরুষ যেমন পুলকিত হয়, পুরুষের শরীর দেখেও নারী পুলকিত হয়। পুলকিত হওয়া, উত্তেজিত হওয়া, আনন্দ পাওয়া, সুখ পাওয়ার অধিকার শুধু পুরুষের নয়, নারীরও আছে। কিন্তু নারীরা পরুষের উপর কেন যৌন নির্যাতন করছে না? ঐ-যে বললাম শিক্ষা, হাজার বছর ধরে পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষাই এই মানসিকতা তৈরিতে সহায়তা করেছে।

আমাদের এই অশিক্ষিত এবং অধ্যশিক্ষিত শিক্ষা মানে যদি যুক্তিবোধ ও মনূষ্যত্ববোধর বিকাশ হয় তবে এই সমাজের আমরা বেশিরভাগ লোকজনই অশিক্ষিত। তাই এই সমাজে অবিকশিত ভাবে বেড়ে উঠা কিশোরদের নারী ভাবনা সবার একি রকম। যারা নিজেকে সুশিক্ষিত করে এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি তারা ধর্ষন করুন কি়ংবা নাই করুন মানষিক ভাবে তারা ধর্ষক।

পুরুষের ভিতর সবসময় আদিম হিংস্রতা, নগ্নতা, নোংরামি ছিল, আছে, থাকবে ; একমাত্র সুশিক্ষার মাধ্যমে আমরা আমাদের পশুত্ব ও আদিমতাকে আড়াল করে রাখি। অশিক্ষিত কিংবা কুশিক্ষিত পুরুষ এইসব বন্য চাওয়া ও পশুত্ব দমন করতে পারে না। আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি পুরুষ মনস্তত্ত্বিকভাবে যেহেতু ধর্ষক তাই এই সমাজে ধর্ষণ ঠেকানো খুবই কঠিন। মৃত্যুদন্ডের ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো ধর্ষণ কিছুটা কমানো যায় কিন্তু বন্ধ করা যায় না।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা ছোটবেলা থেকে এটাই শিখে বড় হয়, নারীর উপর যে পুরুষ যতো বেশি শক্তি প্রদর্শন করতে পারে সে ততো বেশী ‘পৌরুষত্ব’ রাখে। ‘পৌরুষত্ব’ ও ‘নারীত্ব’ এ শব্দগুলো যে সমাজে এত প্রাধান্য পায় সে সমাজে ধর্ষণ বন্ধ করা কঠিন।

ধর্ষণ রোধ করতে চাইলে হাত দিতে হবে গোড়ায়। পিতা মাতা শৈশবে বাচ্চাদের শেখানোর দরকার নেই সে ছেলে কিংবা মেয়ে, সেটা প্রকৃতি ই তাদেরকে শিখিয়ে দিবে। বাবা-মায়ের শিখিয়ে দেয়া বিভাজনের কারনে ছেলে ভাবতে থাকে সে মেয়েদের থেকে আলাদা এবং উন্নত প্রজাতি। এই ভেবে বড় হয়ে নিজকে মানুষ না ভেবে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঠিকভাবে হয় না। এবং বড় হতে-হতে তার দৃষ্টিতে মেয়ে মানেই মহিলা, মেয়েমানুষ এবং যৌনবস্তু , মেয়েকে মানুষ হিসেবে ভাববে না। ঠিক তেমনি শৈশবে মেয়েদের অতিরিক্ত বিধিনিষেধের এবং তুমি মেয়ে, ছেলেদের মতো তুমি এটা ওটা করতে পারবেনা। এভাবে শাসনের মধ্যে বড় হতে থাকা মেয়েরা নিজেদেরকে ছেলেদের থেকে আলাদা এবং হীন প্রজাতি ভাববে, মানুষ ভাবতে পারবে না। তাই বাবা-মায়ের উচিত ছেলেমেয়ের মধ্যে বিভাজন না করে সমান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বড়করা।

খাওয়া, যৌনতা,ঘুম প্রতিটি প্রানীর জীবনচক্রের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িয়ে আছে। তাই বয়ঃসন্ধির পরে নরনারীর সম্পর্ক,বিয়ে, সন্তান, এসব বিষয়ে লুকোচুরি না করে বিজ্ঞানসম্মত কারন সিলেবাসে রাখতে হবে। বাচ্চাদের বুঝাতে হবে প্রাণীজগত সন্তান জন্মদান ও লালন -পালনের প্রয়োজনে নারী-পুরুষের মধ্যে শারীরিক কিছু ভিন্নতা থাকলেও সক্ষমতার দিক দিয়ে উভয়ে সমান যোগ্যতার অধিকারী। উভয়ে একে অন্যকে মানুষভেবে বড় হয়। এবং সামাজিক জীব হিসেবে মানুষকে নানান ধরনের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। চর্চা করতে হয়।পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক নারী- পুরুষের বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব যদি নির্দিষ্ট একটা কমিটমেন্টে আসে তাহলে সেটা প্রেম, আর যদি লিখিত একটা সামাজিক চুক্তিতে আসে, তাহলে সেটা বিয়ে। নারী পুরুষের স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কের জন্য প্রথম শর্ত বন্ধুত্ব। উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ, ব্যক্তিত্বপূর্ণ,সহজ এবং শালীন সম্পর্ক তৈরি হয় তবেই বিকশিত সমাজব্যবস্থায় ধর্ষণ অনেক কমে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত