বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

মব সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের পিটুনিতে কুমিল্লা তিনজন নিহত

আপডেট:

৫ই আগস্ট সরকার পতনের দিন থেকেই ঘটছে একের পর এক মবের ঘটনা। শুরুতে পরিস্থিতি ছিল টালমাটাল। তিনদিন দেশে কোনো সরকার ছিল না। ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে গণহত্যায় অংশ নেয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেরাই ছিল অসহায়। জটিল এক পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নেয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো সক্রিয় হতে শুরু করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে মব বন্ধের আহ্বান জানায়। সময়ে সময়ে দেয়া হয় হুঁশিয়ারি। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর পরও ঘটছে মবে ঘটনা। হচ্ছে প্রাণহানি। বাড়ি-ঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। হামলা হচ্ছে থানায়। পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসব ঘটনা থামাতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মব সহিংসতায় অন্তত ১৭৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে বহু মানুষ। এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর গতকাল কুমিল্লার মুরাদনগরে একই পরিবারের তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর বাইরে জুনে এমন আরও কয়েক জায়গায় পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এমন সব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এভাবে প্রকাশ্যে সংঘদ্ধভাবে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায়, মৃত্যুর ঘটনায় দায় কার এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। মব তৈরি করে মানুষ হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনাগুলোর জন্য মামলা এবং যথাযথ বিচারিক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলেও মনে করছেন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।
কুমিল্লায় একই পরিবারের ৩ জনকে পিটিয়ে হত্যা
মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, মুরাদনগর একই পরিবারের তিনজনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার আকুবপুর ইউনিয়ন ২নং ওয়ার্ডের কড়াইবাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- রুবি বেগম (৫৮), তার ছেলে রাসেল (৩৫), মেয়ে জোনাকি আক্তার (২৭)। রবি বেগমের আরেক মেয়ে রুমা আক্তার গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।স্থানীয়রা জানান, নিহত পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যক্রমে জড়িত ছিল। এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এলাকায় তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধ চলছিল। পূর্ব-বিরোধের জের ধরেই এই বর্বর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, নিহত রাসেলের স্ত্রী মোসাম্মৎ মীম দাবি করেন, সমপ্রতি মোবাইল চুরির ঘটনা নিয়ে বিরোধের জেরেই তাদের পরিবারের চারজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার বিকালে রুবির মেয়ের জামাই মনির হোসেন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রুহুল আমিনের একটি মোবাইল ছিনতাই করেন। এ ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় ইউপি সদস্য বাচ্চু মিয়া এবং আকাবপুর ইউপি চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লাল রুবিকে জিজ্ঞাসা করতে গেলে তাদের ওপর হামলা করা হয়। এতে এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লাল এবং ইউপি সদস্য বাচ্চু মিয়া দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। খবর পেয়ে এলাকার শতাধিক লোক ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের গণপিটুনি দেয়।
এ বিষয়ে আকাবপুর ইউপি চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লাল বলেন, মোবাইল ছিনতাইয়ের একটি ঘটনা আমি জিজ্ঞেস করতে গেলে আমাকে এবং ইউপি সদস্য বাচ্চু মিয়াকে মারধর করা হয়। আমরা সম্মান বাঁচাতে ঘটনা এড়িয়ে এলাকায় চলে যাই। পরে গ্রামবাসীর সঙ্গে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে গণপিটুনিতে মাদক ব্যবসায়ী রুবি, তার ছেলে এবং এক মেয়ে নিহত হয়। আসলে এমন হত্যাকাণ্ড কোনো ভাবেই কাম্য নয়।

এদিকে, বৃহস্পতিবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার নাজির আহম্মদ খান। এ সময় তিনি জানান, আইন হাতে তুলে নিয়ে যারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের শনাক্তে অভিযান শুরু হয়েছে। বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানান, পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষের একটি সন্ত্রাসী দল বৃহস্পতিবার সকালে রুবি বেগমের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রথমে তাদের লাঠিসোটা দিয়ে পেটানো হয়। পরে তাদেরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। ঘটনাস্থলেই রুবি, রাসেল ও জোনাকির মৃত্যু হয়। এরপর স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় রুমা আক্তারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত