সাংবাদিক নিবর্তনের জন্য রাষ্ট্র অনেক রকম পথ খোলা রেখেছে এমন কথা জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘আকাশের যত তারা, আইনের তত ধারা। সাংবাদিকদেরকে নিবর্তনের জন্য, নিয়ন্ত্রণের জন্য আকাশের সব রকম তারার মতো আইনের ধারা প্রয়োগ করা হয়।গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫’ সম্মেলনের তৃতীয় দিনের এক পর্বে তিনি এ কথা বলেন।সাংবাদিকদের ওপর প্রয়োগ হয় এমন নিবর্তনমূলক আইনের অবসান চাওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা প্রোপাগান্ডা’ রুখতে সংবাদমাধ্যমের তরফে নীতি প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।আইনের কোনো ধারায় না পড়লে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা বলেন, এই প্রবণতা পরিবর্তন করতে হলে রাষ্ট্রের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন, যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তাদের মানসিকতার মধ্যে পরিবর্তন না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে আক্রমণ করে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি মনে করি না।দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানি এবং দেওয়ানি মামলায় ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন ধারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগের সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, এটা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করা যায় না বলে কালো আইন হয়েছে।রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে’ ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন নিয়ে এসে সাংবাদিককে হয়রানি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আমরা এ সমস্ত নিবর্তন এবং নির্যাতনমূলক আইন, যে আইন কণ্ঠরোধ করে, যে সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দেয়, আমরা সেই আইনের অবসান চাই। এবং এ বিষয়ে রাজনীতিক যারা নেতৃত্বে থাকবেন আগামী দিনে, তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ বিষয়গুলো আবার ভেবে দেখা।গণমাধ্যমের তরফে নাগরিকদের হয়রানি রুখতে উপায় বের করার আহ্বান জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাংবাদিকদের কাছেও প্রত্যাশা থাকবে, আপনারা এমন একটা ফর্মুলা দেন আমাদের, যে ফর্মুলায় নাগরিক যে হলুদ সাংবাদিকতার শিকার হচ্ছেন, মিথ্যা প্রোপাগান্ডার শিকার হচ্ছেন নাগরিক, নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আপনারা একটা ফর্মুলা বের করেন। যাতে নাগরিকরাও সুরক্ষিত থাকে। আপনি নাগরিককে অরক্ষিত রেখে শুধু নিজের সুরক্ষা করবেন, তখন সেটা সমাজে একটা ভুল বার্তা দেবে।এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের সমস্ত নিবর্তনমূলক আইন থেকে ফিরে আসা উচিত হবে। এটা আমার তাদের প্রতি সুপারিশ থাকবে।আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, রাষ্ট্র কীভাবে ডিএসএ-তে ফেরা থেকে বিরত থাকবেন, সেটা নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবেন। এবং যারাই নির্বাচিত হবেন, আশা রাখব, তারা ডিএসএ-তে ফিরতে চাইবেন না। আশা রাখব, তারা সাংবাদিকসহ স্টেকহোল্ডারদের থেকে সুপারিশ নিয়ে, নাগরিক অধিকার এবং সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বের অধিকার সুরক্ষার জন্য ব্যালেন্স অব কনভেনিয়েন্স অ্যান্ড ইন-কনভেনিয়েন্সের একটা পথ খুঁজে পাবেন। এবং সেই পথ মসৃণ হবে।ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলাগুলো নিষ্পত্তির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যেগুলো স্থগিত আছে, সেগুলো অতি দ্রুত হাই কোর্টের কোনো একটি বেঞ্চে দিলে আমি দরকার হলে নিজে গিয়ে বলব যে, ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি করে দেন। আর যেগুলো এফআইআর স্টেজে আছে, তাদেরকে বলব সংশ্লিষ্ট থানায় বলেন, এটা ফাইনাল রিপোর্ট করে দেবে। কারণ সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলায় লেনিয়েন্সি (নমনীয়তা) দেখিয়েছে।তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেগুলো কথা বলা সম্পর্কিত অপরাধ, সেগুলোর সবগুলো ডিসচার্জ করে দিতে বলেছে। অন্যগুলোতেও সরকারের মনোভাব হল, আমরা খুব লেনিয়েন্সি থেকে দেখছি।সিজিএসের গবেষণা সহযোগী রোমান উদ্দিনের সঞ্চালনায় সংলাপের এ পর্বে অন্যদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী এবং ট্রায়াল ওয়াচের জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম ম্যানেজার মানেকা খান্না বক্তব্য দেন।

