ডক্টর মনজুর মোরশেদ
সম্প্রতি বাংলাদেশের হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেছে, যা পুনরায় আলোচ্য হয়েছে সমাজজুড়ে—প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই একজন পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন, তবে তা শুধুমাত্র সালিশি (আরবিট্রেশন) কাউন্সিলের অনুমতির পরে বৈধ হবে। এই রায়টি মুসলিম পারিবারিক আইন (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)–এর ধারা ৬–এর প্রেক্ষাপটে এসেছে। আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, আইনে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্মতি বাধ্যতামূলক নয়; বরং এটি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এই কাঠামোর মধ্যে স্ত্রীর মতামত গ্রহণ করা হলেও তা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।আইনের ইতিহাস ও বাস্তব প্রেক্ষাপট বোঝা অত্যন্ত জরুরি। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণয়নের আগে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় বহুবিবাহ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং এর জন্য সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পরবর্তীতে এই আইন প্রণীত হওয়ার মাধ্যমে বহুবিবাহ পুরোপুরি বৈধ না করে, বরং কিছু শর্ত আরোপ করা হয়—যার অন্যতম হলো সালিশি কাউন্সিলের অনুমোদন। অর্থাৎ আইনটি বহুবিবাহকে উৎসাহিত করেনি; বরং সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত করেছে।এই রায়ের ভিত্তি মূলত আইনের সরল পাঠ। আদালতের মতে, একজন পুরুষ যদি দ্বিতীয় বিয়ের প্রয়োজনীয় কারণ, আর্থিক সামর্থ্য এবং উভয় স্ত্রীর প্রতি ন্যায্য আচরণের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারেন এবং সালিশি কাউন্সিলের অনুমোদন লাভ করেন, তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে আইনসম্মত। আদালত আরও উল্লেখ করেছেন, আইনের ভাষা ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী এই বিধান কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে না।কিন্তু আইনি বৈধতা আর সামাজিক ন্যায্যতা সব সময় এক নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় গড়ে ওঠা, যেখানে নারীর আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা অনেকাংশে বৈবাহিকসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম স্ত্রীর সম্মতিকে বাধ্যতামূলক না করা নারীর মানসিক স্থিতি, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। দ্বিতীয় বিয়ে কেবল একটি নতুন সম্পর্ক নয়; এটি প্রথম স্ত্রীর জীবনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে এই রায় নারীর মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব হ্রাস করছে কি না—সে প্রশ্ন অমূলক নয়।তবে এখানেই আলোচনা শেষ করলে সেটি হবে একপেশে। আমাদের সমাজে একটি বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত—পুরুষও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তারা মানসিক নির্যাতন, অপমান, সামাজিক হেয় প্রতিপন্ন হওয়া, সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি কিংবা মিথ্যা মামলার ভয় নিয়ে নীরবে জীবনযাপন করেন। সমাজ তাদের শেখায়—পুরুষ দুর্বল হতে পারে না, অভিযোগ করতে পারে না। ফলে তাদের কষ্ট অদৃশ্যই থেকে যায়।শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। স্ত্রী কর্তৃক পুরুষ নির্যাতিত হলে সেটিকে অনেক সময় তামাশা বা অবিশ্বাসের চোখে দেখা হয়। অথচ নির্যাতনের কোনো লিঙ্গ নেই। মানসিক নির্যাতন অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে—যা ব্যক্তির আত্মসম্মান, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতি ধ্বংস করে দেয়।আইন ও সমাজ যদি কেবল নারীকে ভুক্তভোগী এবং পুরুষকে অপরাধী হিসেবে দেখার প্রবণতা বজায় রাখে, তাহলে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এতে যেমন প্রকৃত নারী ভুক্তভোগীর সংগ্রাম দুর্বল হয়, তেমনি নিরপরাধ পুরুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। আইনের অপব্যবহারও তখন একটি বাস্তব সমস্যায় পরিণত হয়।আমাদের সমাজে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে—আইনের চোখে কি সত্যিকারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যদি সেখানে মানবিক বাস্তবতা উপেক্ষিত থাকে? দ্বিতীয় বিয়ে আইনসম্মত হলেও তা কি নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে? বিয়ে কেবল আইনি চুক্তি নয়; এটি পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও দায়িত্বের সম্পর্ক।এই রায়ের বিরোধী পক্ষ যেমন বলছেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিকে বাধ্যতামূলক করা হলে পারিবারিক স্থিতি ও সমতার ভিত্তি আরও শক্ত হতো। আবার অন্যদিকে, পুরুষের ভুক্তভোগিতাকেও আইন ও সমাজের আলোচনায় আনতে হবে—এটিও সময়ের দাবি।
শেষ কথা
নারী বনাম পুরুষ—এই দ্বন্দ্বে সমাধান নেই। সমাধান রয়েছে লিঙ্গনিরপেক্ষ ন্যায্যতায়। প্রয়োজন এমন আইন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানেনারী নির্যাতিত হলে ন্যায়বিচার পাবেন,পুরুষ নির্যাতিত হলেও ন্যায়বিচার পাবেন,এবং দ্বিতীয় বিয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আইন শুধু বৈধতা নয়, দায়িত্ববোধও নিশ্চিত করবে।আদালত আইন ব্যাখ্যা করে, কিন্তু সমাজের বিবেক গড়ে তোলে আমরা সবাই। প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত—
আমরা কি এমন সমাজ চাই, যেখানে বিচার লিঙ্গ দেখে হবে, নাকি মানুষ দেখে হবে?

