ফেনীর শিক্ষা অঙ্গনে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে। গত পাঁচ বছরে জেলায় এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে ৪০% হ্রাস পেয়েছে। যে জনপদ একসময় মেধা ও মনন চর্চায় অগ্রগণ্য ছিল, সেখানে শিক্ষার্থীর এই ব্যাপক ঘাটতি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ও কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই নিম্নমুখী গ্রাফ আমাদের স্পষ্ট জানান দিচ্ছে—শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বা সুযোগের জায়গায় বড় ধরনের কোনো ফাটল তৈরি হয়েছে।
দায় কার?শিক্ষার্থীর সংখ্যা এভাবে কমে যাওয়ার পেছনে কোনো একক পক্ষকে দায়ী করা অসম্ভব।
রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজ: স্থানীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারক এবং সুশীল সমাজ যদি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং ঝরে পড়া রোধে কার্যকর জনমত গঠন করতে না পারেন, তবে এর দায়ভার তাদের ওপরই বর্তায়।শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটির তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা কেন স্কুল থেকে বিমুখ হচ্ছে বা কেন তারা মাধ্যমিক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না, তার গভীরে গিয়ে তদন্ত করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল।আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট: ফেনী অঞ্চলের একটি বড় অংশ প্রবাসমুখী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিশোর বয়সেই পড়ালেখা বাদ দিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বা কারিগরি শিক্ষার অভাব সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঝরিয়ে দিচ্ছে। তবে ৪০ শতাংশের এই বিশাল পতন নির্দেশ করে যে, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও প্রবল।
সংকটের গভীরতা ও প্রভাব
একটি জেলায় যখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেক হয়ে আসে, তখন বুঝতে হবে সেই জনপদের মেধা-বিকাশ স্থবির হয়ে পড়ছে। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হবে ভয়াবহ। দক্ষ জনশক্তির অভাব তৈরি হবে এবং সমাজ ক্রমান্বয়ে অসচেতনতার দিকে ধাবিত হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে যে শিক্ষার্থীরা ঝরে যাচ্ছে, তারা পরবর্তীতে কোন ধরনের শ্রমবাজারে ঢুকছে এবং কেন তারা পড়াশোনা শেষ করতে পারছে না—এটি এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।
আশু করণীয়
এখনই সময় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার। আর দেরি করলে এই ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে দাঁড়াবে।
১. যৌথ তদন্ত ও জরিপ: শিক্ষা বিভাগকে অবিলম্বে প্রতিটি ইউনিয়নে জরিপ চালিয়ে বের করতে হবে কেন শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে না।
২. উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি: রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে অভিভাবক সমাবেশ ও সচেতনতা ক্যাম্পেইন গড়ে তুলতে হবে।
৩. মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ: ভিত্তিমূল ঠিক না থাকলে মাধ্যমিকের সংকট কাটবে না। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ ও শিক্ষার মান বাড়াতে হবে।
৪. কারিগরি শিক্ষার প্রসার: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পায়।ফেনীর শিক্ষা ব্যবস্থার এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে আমজনতা—সবাইকে একজোট হতে হবে। আমাদের সন্তানরা কেন ক্লাসরুম ছেড়ে যাচ্ছে, তার উত্তর খোঁজা এবং তাদের ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
ফেনী পরীক্ষার্থী হ্রাসের অশনি সংকেত—আমাদের শিক্ষা ভাবনা ও ভবিষ্যৎ কোন পথে?
আপডেট:

