বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড ছিল রাজনৈতিক পট পরিবর্তন পর আবারও উত্তপ্ত

আপডেট:

দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড ছিল অনেকটাই শান্ত। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সব কারাবন্দি থাকায় এ সময়ে নতুন কোনো ভয়ংকর সন্ত্রাসীর পক্ষে আর আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু হঠাৎ একযোগে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই অশান্ত হতে থাকে আন্ডারওয়ার্ল্ড। গত বছর এলিফ্যান্ট রোডে এক ব্যবসায়ীর ওপর হামলার ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হওয়ার পর থেকে সামনে আসতে থাকে নেপথ্য নায়কদের নাম।
ওই এলাকার মার্কেট, গার্মেন্টস ও ব্যবসায়ীদের ওপর কার কতটুকু প্রাধান্য থাকবে এই নিয়েই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও হেলালের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ পায়। তারপর সর্বশেষ সোমবার মিরপুরে যুবদল নেতা কিবরিয়ার ওপর সিনেমাটিক স্টাইলে হামলা চালিয়ে হত্যার পর আবারও দেশ বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম সামনে আসে। এর আগে গত সপ্তাহে আদালতে হাজিরা দিয়ে বাসায় ফেরার সময় ন্যাশনাল মেডিক্যালের সামনে অবিশ্বাস্য কায়দায় দিনদুপুরে হামলা চালিয়ে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুনকে খুন করার ঘটনায় বিস্মিত হয়ে পড়ে খোদ আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। তারা এ ঘটনায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে হুকুমদাতা হিসেবে সন্দেহের শীর্ষে রেখেছে। একই কায়দায় চট্টগ্রামেও বিএনপির একজন প্রার্থীর কর্মীকে দিনদুপুরে হত্যা করায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এভাবে একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের আরও খুনখারাবির মতো অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থারাও এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে আগাম সতর্কতা নেওয়া ও তৎপরতা জোরদার করার ওপর জোর দিচ্ছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের সঙ্গে আলাপ করে এ ধরনের তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এতে গোটা ঢাকাবাসী চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যেভাবে একের পর চাঞ্চল্যকর হত্যাকা- সংঘটিত হচ্ছে, বিশেষ করে সোমবার মিরপুরের যুবদল নেতা কিবরিয়া, পুরানো ঢাকায় আদালত প্রাঙ্গণে সন্ত্রাসী মামুন ও চট্টগ্রামে সারোয়ার বাবলা ও ঢাকাইয়া আকবরকে হত্যা করা হয়েছে। তাতে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। হঠাৎ কেন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এতটা ভয়ংকর ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। তবে এটা ওপেন সিক্রেট, আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে তাকে হত্যা করা হয়েছে।টানা দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এসব সন্ত্রাসীরা কারাবন্দি থাকায় নিজ নিজ চাঁদার খনি ও সা¤্রাজ্য বেহাত হয়ে যাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। হারানো সমরাজ্য পুনরুদ্বারের জন্যই ফের লিপ্ত হয় প্রাধ্যান্য বিস্তারের লড়াইয়ে। শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন থেকে শুরু করে পল্লবীর যুবদল নেতা কিবরিয়া, এলিফ্যান্ট রোডের ব্যবসায়ীর ওপর থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের ঢাকাইয়া আকবর ও সারোয়ার বাবলাকে হত্যার ঘটনায় এখনো পর্যন্ত সন্দেহের শীর্ষে রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই। যারা গত বছরের ক্ষমতার পালাবদলের পরপরই একযোগে সবাই কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে কিছুদিন রাজধানীতে ঘাপটি মেরে থেকে ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে ওঠে নিজ নিজ এলাকায়।তারই ধারাবাহিকতায় এখন রাজধানীতে পড়ছে একের পর এক লাশ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা ও অপরাধের পরিসংখ্যান আরও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে বলে গোয়েন্দারা শঙ্কিত। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার আগে তাদের জামিননামা হয়। সেখানে তাদের পক্ষে কে বা কারা জামিনদার হয়েছেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হলেই সন্ত্রাসীরা কিছুটা হলেও দমে থাকবে।সাধারণত এ ধরনের দাগী সন্ত্রাসীরা কারামুক্ত হওয়ার পর পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তাদের ওপর যেভাবে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও খবরদারি রাখা বাধ্যতামূলক ছিল, সেটা ঠিকমতো হচ্ছে কি না সেটা দেখতে হবে। কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনসহ অন্যদের কর্মকা- দেখে তো মনে হয় তারা আগের মতো মুক্ত বিহঙ্গ। নির্বাচনকে সামনে রেখে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ফের গ্রেপ্তার করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের অবশ্যই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। নচেৎ এর জন্য অনেক খেসারত দিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন, আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, খন্দকার নাঈম ওরফে টিটন ও ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুসহ বেশ কজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী কারাগার থেকে মুক্তি পায়। মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগরের মতো কয়েকজন বিদেশ থেকে ফিরেছে। তারা অল্পদিনেই সংগঠিত করে ফেলতে সক্ষম আগের মতো নিজেদের ক্যাডারদের।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পান কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তারপর ঘটতে থাকে একের পর এক খুনখারাবি। বিশেষ করে মামুন হত্যাকা-ের মধ্য দিয়েই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জানান দিচ্ছে, তারা আগের মতো ভয়ংকর। এসব হত্যাকাণ্ড ও গোলাগুলির ঘটনার সঙ্গে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত শত্রুতার সম্পর্ক রয়েছে। এটা সামনে আরও ব্যাপকতা পাবে। নির্বাচনের আগে পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কিছু রাজনৈতিক নেতা এসব অপরাধী চক্রকে মদদ দিচ্ছেন। যাকে কেন্দ্র করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হোতাদের মধ্যে লড়াই আরও ভয়ংকর হতে পারে।এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময় ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রচারে হামলা এবং ফলাফলকে প্রভাবিত করতে অপরাধী চক্রগুলোকে ‘ভাড়াটে পেশিশক্তি’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। বিদেশে থাকা কয়েকজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী দেশে থাকা তাদের নেটওয়ার্কগুলো সক্রিয় করছে। রাজনৈতিক কুশীলবরা তাদের ব্যবহার করছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি, জমি দখল ও মাদকের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে আবারও আধিপত্যের লড়াইয়ে নেমেছে। এবার কিশোর গ্যাংগুলোকেও তারা কাজে লাগাচ্ছে।
ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আগের মতো নিজ নিজ এলাকায় নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়েছেন। সুব্রত ও মাসুদ বিদেশ থেকে ফিরে গ্রেপ্তার হলেও এখনো তাদের এলাকায় চলছে চাঁদাবাজি ও জমি দখল। সুব্রত এক সময় মগবাজার, মতিঝিল, পল্টন ও মালিবাগে প্রভাবশালী থাকলেও তার গ্রেপ্তারের পর জিসান গ্রুপ এখন মালিবাগ, মতিঝিল, মগবাজার, বাড্ডা ও মহাখালী নিযন্ত্রণ করছে। তারা বড় বড় চুক্তি-জমি ও ব্যবসা থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে। একই কায়দায় ধানমনি- মোহাম্মদপুরে ইমন, পিচ্চি হেলালের নেতৃত্বে চলছে অপরাধ।এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেছেন, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কিছুটা তৎপর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের নজরদারির দরুন তাদের কেউ কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। যদিও সম্প্রতি দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুনের মধ্যে লড়াই ও বিরোধ বেড়েছে। মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই মামুনকে হত্যা করা হয়। ইমনের সহযোগী রনি এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেয় এবং দুজন বন্দুকধারীকে দুই লাখ টাকা দেয়। তবে এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে গোয়েন্দা তৎরপতাও বাড়ানো হয়েছে। এদের বাইরেও দু’একজন সন্ত্রাসী হয়তো এখনো দেশে রয়ে গেছে। তাদেরও ধরার চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত