নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভুক্তভোগী কিশোরীকে ‘পরিকল্পিতভাবে’ হত্যায় ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। পরে আসামিদের শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নরসিংদীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিমান্ডের জন্য প্রেরণ করে পুলিশ।গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন আহম্মদ আলী দেওয়ানের ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২), একই এলাকার প্রয়াত সাহাবুদ্দিনের ছেলে এবাদুল্লাহ (৪০), মো. আজগর আলীর ছেলে মো. আইয়ুব (৩০) ও হোসেন বাজার এলাকার প্রয়াত মজিবুরের ছেলে গাফ্ফার (৩৪)।অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিশোরীকে পুনরায় ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহ সরিষাখেতে ফেলে দেওয়া হয়।শুক্রবার ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ‘গত ১৫ দিন আগে ধর্ষণের শিকার হন আমেনা। স্থানীয় বকাটে নুরাসহ চারজন মিলে ধর্ষণ করেন আমেনাকে। সেই ধর্ষণের সালিশ বিচার করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও মেম্বার আহম্মেদ আলী। তিনি ৮ হাজার টাকায় দায় মুক্তি দেন নুরাসহ ৪ জনকে। তবে সে টাকাটাও আমেনার পরিবার পাইনি। ঘটনার ৫ দিন পরে আবার আমেনাকে মারধর করেন নুরাসহ কয়েকজন। আমেনাকে নিয়ে উল্টো গ্রাম ছেড়ে বরিশাল চলে যাওয়ার জন্য মা-বাবাকে চাপ প্রয়োগ করেন স্থানীয় মেম্বারসহ নুরা।স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান এর আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, কিশোরীর বাবা বরিশালের বাসিন্দা। কাজের সুবাদে স্ত্রী-কন্যাসহ মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতেন তারা। ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নুরার নেতৃত্বে ৫-৬ জনের একটি দল এলাকা থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর বিচার চেয়ে নিহতের পরিবার মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানের দ্বারস্থ হয়। সেখানে অভিযুক্ত ও তাদের সহযোগীরা মোটা অংকের টাকা দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করেন।ওই সময় রফাদফা না হওয়ায় নিহতের পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। এরপর বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে কাজ শেষে মেয়েকে নিয়ে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথে বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে আরও পাঁচজন কিশোরীকে তুলে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের লোকজনসহ বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। পর দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে একই এলাকার একটি সরিষাখেত থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো মরদেহটি দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। রাতে নিহত কিশোরীর মা বাদী হয়ে মাধবদী থানায় মামলাটি করেন।মাধবদী থানায় কথা হয় আমেনার বাবা আশরাফ ও তার মা ফাহিমার সঙ্গে। তারা বলেন, ‘আমার মেয়ের লাশ হাসপাতালে পড়ে আছে, কোথায় এনে মাটি দেব সেই জায়গাটাও নেই। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই আমার মেয়েকে দাফন করতে দেওয়া হচ্ছে না স্থানীয় কবরস্থানে। স্থানীয় কবরস্থানের লোকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা এখানে মাটি দিতে মানা করেছে। মেয়ের লাশ নিয়ে আমি যে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাব সেই টাকা নেই। মর্গে থেকে লাশ আনার টাকাটাও আমার কাছে নেই। আপনারা পারলে লাশ দাফনের একটু ব্যবস্থা করে দেন। পুলিশসহ সবাই আমাদের সহযোগিতা করছে, তবে লাশ দাফনে বাধা দিচ্ছেন স্থানীয়রা।’এদিকে শুক্রবার সকালে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক পরিদর্শনে আসেন ঘটনাস্থলে। তিনি এসে সাংবাদিকদের জানান, কোনো আসামিকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রত্যেকে আইনের আওতায় আনা হবে। তাদের কঠিন শাস্তি হবে। এখন পর্যন্ত পাঁচ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য সব টিম কাজ করছে। বিশেষ করে আসামি নুরাকে গ্রেপ্তার করতে সবাই মিলে কাজ করছি।’অন্যদিকে শুক্রবার সকাল দশটায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন। তিনি বলেন, ‘আসামি যে দলেরই হোক না কেন, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাকে কঠিন বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। আমি প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় বলেছি দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করার জন্য।’ মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, ধর্ষণের ঘটনায় ৯ জনকে আসামি করে মামলার পর পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকিদেরও গ্রেপ্তার চেষ্টা চলছে।

