#রুপালী_নক্ষত্রের_রাত_৪৬_
(পূর্ব প্রকাশিতের পর) পরের দিন মঙ্গলবার দিনটা শুরু হল মেঘ বৃষ্টি দিয়ে। তখন জুলাই বা অগাস্ট মাস হবে। এমনিতেই বর্ষাকাল তার উপর দিন যদি বৃষ্টি দিয়ে শুরু হয় তাহলে বিকালে কি হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়। আমরা দু’ভাই বোন সকালে নাস্তার টেবিলে চকিতে দৃষ্টি বিনিময় করলাম। শান্তার দৃষ্টিতে আমাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি মুষড়ে পড়লাম। এত আয়োজন সব মাঠে মারা যাবে ? দুপুরে হুট করে অপু মামা এসে উপস্থিত হলেন। বাসার আবহাওয়া বদলে গেল। মা খুশি হলেন। মা’র খুশি মানে আমাদের স্বস্তি। দুপুরের দিকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। শান্তা একফাঁকে বলল , ভাইয়া বিকালে রোদ উঠলে আমরা বের হব। আমি বললাম , আচ্ছা।
সেদিন হয়ত প্রকৃতি আমাদের উপর সদয় ছিল। দুপুর না গড়াতেই ঝাঁঝালো রোদ উঠলো। বিকালে দেখা গেল মেঘমুক্ত নীলাকাশ আর মৃদু দখিণা হাওয়া। আমার মনে হল প্রকৃতি বলছে , দেখো তোমাদের জন্য কী সুন্দর রোদ সাজিয়েছি , তোমরা দেখবে বলে , এসো আমার সূর্যাস্ত দেখবে…. এসো ….
আমি আর শান্তা সাড়ে পাঁচটার বের হলাম। ও সাথে একটা বই নিয়েছে। কিসের বই এখন আর মনে নেই। ও মাকে বলেছে বইটা ওর এক বান্ধবীর। বইটা ফেরত দিতে হবে আজই। ওর বান্ধবীর বাসা আমাদের বাসার শ–খানেক গজ পশ্চিমে। ‘বইটা ফেরত দেবো আর ভাইয়াকে নিয়ে ঘুরব ‘ ও মাকে বলেছে। মার আজকে মন ভাল। মা বলেছেন , আচ্ছা তাড়াতাড়ি এসো। শান্তার আই কিউ আমার চেয়ে দশগুন ভাল। ও যেভাবে মা’কে ম্যানেজ করেছে তা আমি হলে গুবলেট হয়ে যেত এবং এক পশলা মার খেতে হত। আসলে আমার আই কিউ আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবার নিম্নে। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তা হরহামেশাই প্রমানিত।
বাসা থেকে বের হয়ে আমরা পশ্চিম দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আমি বললাম , বইটা যে নিলে আসলে দেবে কাকে ? শান্তা বলল , সামনে আমার বান্ধবী নার্গিসদের বাসা। ওকে বইটা দিয়ে বলব রেখে দিতে। কয়েকদিন পর স্কুলে বইটা ফেরত দিয়ে দিতে বলব। আমি চমৎকৃত হলাম। শান্তার একটা হাত ধরে বললাম , তোমার অনেক বুদ্ধি আপু। শান্তা বলল , আমি যে তোমার বোন। আমি মনে মনে আদ্র হয়ে গেলাম। আমার এই বোনটা হয়ত আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সংসারে একটি আশীর্বাদ।
আমাদের বাসা পেরিয়ে পশ্চিম দিকে আদাবরের এই দিকটা অনেকটা ফাঁকা। চতুর্দিক খোলা স্থানের উপর দোতলা একটি দালান। এটাই নার্গিসদের বাসা। ওর বাবা এজি অফিসে চাকুরী করেন। এটা উনি নিজে করেছেন৷ ছোট খাট দালানটি সুন্দর লাগল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শান্তা , নার্গিস এই নার্গিস বলে ডাক দিল। আমি দেখলাম শান্তার চাইতে দু’তিন বছরের বড় একটি শ্যামলা রঙের মেয়ে বেরিয়ে এলো। এসেই শান্তাকে , ‘ওমা শান্তা’ বলে জড়িয়ে ধরল। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। শান্তা এবং নার্গিস বিচিত্র বাংলায় দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলা শুরু করল। এটা আমি সারা জীবন দেখেছি দু’তিনটি মেয়ে একত্র হলে তারা যে ভাষায় কথা বলে তা বোঝা যায়না কারন তারা সকলে একত্রে কথা বলে। কে কি বলছে এবং কে কার কথা শুনছে আপনি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছুই বুঝবেননা। তারা অবশ্য সব বুঝে। আমি দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে আড় চোখে দেখলাম। শ্যামলা হলেও মেয়েটি সুন্দরী। ওড়না ছাড়া চলে আসাতে ওকে আমার কিশোর চোখে সীমাহীন লাবন্যময়ী মনে হল। আমি চকিতে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। শান্তা ডাকল , ভাইয়া এদিকে আসো। আমি ধীরে ধীরে আরেকটু কাছে গেলাম। মেয়টিকে এবার পুরোপুরি দেখা গেল। তার গালে সামান্য ব্রন। ওই অংশটুকু লাল হয়ে আছে। শান্তার চেয়ে সামান্য লম্বা এই মেয়েটিকে দেখে আমার ভাল লাগল। আমাকে দেখে সে লাজুক হাসল। একটু জড়সড় হল কারন সে ওড়না আনেনি। সালাম দিয়ে বলল , ভাইয়া ঘরে চলেন , এই শান্তা আয় বলে তাকে টানা শুরু করল। আমি সংকোচে কিছু বলতে পারলামনা৷ আমার কেন জানি খুব লজ্জা লাগছিল। আমার আবারো মনে পড়ল , মামুন বলেছিল , তুই শালা গবেট , তোকে দিয়ে কিছু হবেনা …। আমি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম। শান্তা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে নার্গিসের হাত থেকে বাঁচল।
আমরা আবারও পশ্চিম দিকে রওনা হলাম। যাবার সময় শান্তা পিছন ফিরে হাত নাড়ল। আমিও পিছন ফিরলাম। ও হাত নাড়ছে আর বলছে , ভাইয়া আবার আসবেন। শুনে আমার হৃদয়টা একটা বিট মিস করল। নার্গিস কি এমনিতেই বিদায় ক্ষনে বলেছিল কথাটা নাকি সে সত্যিই চেয়েছিল আমরা আবার যাই তাদের বাসায়। অনেক পরে কোন এক অনুষ্ঠানে ওর সাথে আমার আরো একবার দেখা হয়েছিল। সেটাই শেষ। শান্তার কয়েকটি বান্ধবীকে আমি চিনতাম। সব-কটি মেয়েই সেরা ছিল। মেধাবী এবং শ্রেনীতে তাদের অবস্থান ছিল সামনের দিকে। ও মিশত কম। বান্ধবীও ওর কম ছিল। অনেকটা আমার মতই। হাটতে হাটতে আমি বললাম , ওকে বুঝিয়ে বলেছত বইয়ের বিষয়টা। শান্তা হাসল। বলল , ভাইয়া পৃথিবীর সবাই তোমার মত সরল না। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। শান্তা আমার দিকে এবার একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল , ভাইয়া জান নার্গিস বলছিল , তোর ভাইয়াটা খুব সুন্দর। শুনে আমি আবারও আমার হার্টের একটা বিট মিস করলাম। আমি স্বলজ্জ হেসে বললাম , যাহ কি বল তুমি….। ও বলল , নার্গিস তোমাকে আগেও দেখেছে যখন তুমি আমাকে স্কুল থেকে আনতে যাও। এইভাবে আমরা আরো পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকি আদাবর খালের দিকে। আমি আর শান্তা অবিস্মরণীয় কিছু কথা বলি যা আমার মস্তিষ্কের কোষে আজীবনের জন্য জমা হয়ে যায়। ছোট বোনটার সাথে বেদনাময় সুখ স্মৃতি জমা হয়। ভবিষ্যতের কোন এক সময়ে যা আমাকে হয়ত ভাবাবে আর সুখের অশ্রুতে কাঁদাবে। (চলবে)
কাহিনী নয় , জীবনের গল্প
ফেইসবুক থেকে নেওয়া।
রুপালী নক্ষত্রে রাত **হাসান সাইদ
আপডেট:

