বৃহস্পতিবার, মার্চ ১২, ২০২৬

____আনন্দ_বেদনার_কাব্য —ওহিদুল_আলম_পিটু

আপডেট:

ধুৎ ! বড় এবং অখ্যাতদের আবার জন্মদিন হয় নাকি! ছেলেবেলায় প্রথম জন্মদিনের অনুষ্ঠান দেখেছিলাম বাংলা ছবিতে। তারপরে বড় হতে হতে দেখতাম টিভিতে। তখন জন্মদিন পালনের আয়োজন করতো অতি উচ্চ শ্রেণির ধনী পরিবারগুলো তাদের সন্তানের জন্য। শহরের কালচারে বিখ্যাত ব্যক্তিদের দু’চারটা জন্মদিনের খবর পেতাম পত্রিকার পাতায়। মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মারা আমাদের জন্মদিন পালন তো দুরের কথা জন্ম তারিখও ভুলে যেতেন। তাই বলে মা-বাবারা কি আমাদেরকে ভালোবাসতেন না ? নিশ্চয়ই বাসতেন কিন্তু তখন মধ্যবিত্ত পরিবারে এবং মফস্বল শহরে জন্মদিন পালনের সংস্কৃতি চালু ছিলো না।ছোট মামার বিয়ের দিনটিতে আমার জন্ম হওয়ায় কিশোর বয়সেই মামা আমার জন্মের তারিখটি স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু কখনোই জন্মদিন পালন বা কেক কাটার আয়োজন করা হয়নি মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির জন্যে। গত কয়েক বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমার জন্মদিনটি আমাকেই স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ফেসবুকবন্ধুরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায় উইশ-টুইশ করে। মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ সংস্কৃতিতে জন্মদিন ধারাটির সাথে পরিচয় না-থাকার কারণে মানিয়ে নিতে পারিনি। তাই দিনটি আসলেই লজ্জায় আড়ষ্টতায় বিব্রত বোধ করি।
এখন জন্মদিন আসলে আমার মেয়ে মনে করিয়ে দিয়ে বলে-বাহিরে ঘুরতে এবং খেতে যেতে হবে। আর সহধর্মিণী মুখরোচক রান্নার আয়োজন করে। বউ,মেয়ের সাথে একান্তে কিছু আনন্দঘনমুহূর্ত ভাগাভাগি করে নিই এবং ভাবি এই যে আজকের এই রঙিন সন্ধাটি চলে যাচ্ছে জানি তা আর ফিরে আসবে না। আবার একটা নতুন দিন, আবার ছুটে চলা ক্ষুধা মিটাতে;ক্ষুধা বলতে পেটের, চোখের, মনের ক্ষুধার কথা বলতে চাচ্ছি। বুঝ হাওয়ার পর থেকে নিরন্তর ছুটছি তো ছুটছি; জানি এই যে উদয়াস্ত ক্ষুধার পিছনে ছুটেচলা থেকে নিষ্কৃতি নেই। জীবনটাই ক্ষুধার দুষ্টচক্রে আটকে গেছে।বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এখন প্রায় আলস্য পেয়ে বারবারই আমার মন নষ্টালজিক হয়ে পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব মিলাতে ফ্ল্যাশব্যাকে অতীত পরিভ্রমণে বেরোই। এসময়ে যাপিত জীবনের ব্যর্থতাগুলো বুড়ো আঙ্গুল উঁচু করে জিভ বের করে ভেংচি কেটে আমার অসহায়ত্ব এবং অযোগ্যতার চালচিত্র যেমন সামনে নিয়ে আসে ঠিক তেমনি কিছু সত্যকারে বন্ধু…..ব্যর্থ প্রেমের কিছু স্মৃতি… রক্তের কিছু বন্ধন… দাম্পত্য জীবন…. সন্তান… কিছু কিছু মানুষের অযাচিত ভালোবাসা আমার বেঁচে থাকাটা অর্থবহ করেছে। এখন এক-একটা জন্মদিন আসে আর বেঁচে থাকা থেকে আরও একটা বছর কমে যাওয়াটাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি।প্রতিনিয়তই উত্তর না জানা কিছু প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়; কেন আসলাম ? কি করছি ? কেন চলে যেতে হবে ? কোথায় চলে যাবো ? হাতে আর কতটুকু সময় আছে ? অতঃপর সব লেনদেন অমীমাংসিত রেখে একদিন মাটির ঘরে সোজা নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে আতর মেখে দরজায় খিলি দিয়ে শুয়ে পড়বো অনন্তকালের জন্য।আমি যদি এখন চলে যাই আমার সাথে শুধু আমার দেহটা নিয়ে যাবো। রেখে যাবো প্রিয় মুখগুলো ছাড়াও এই সময়ের সবচেয়ে আপন সঙ্গী কালো চশমাটা এবং সস্তা একটা ঘড়ি, কিছু জামাকাপড় ও জুতা, বেল্ট, টুপি, একটি সাধারণ মানের সেলফোন,পুরানো একটি বাইক, জমানো কিছু টাকা আর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রেখে যাচ্ছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিজিবিজি ভাবনার কয়েকটি পোস্ট এবং আপলোড করা কিছু ছবি। কি কি রেখে যাচ্ছি তা পুরোপুরি বলাটা অনিশ্চিত, চলে যাওয়াটাই সত্য। চলে যাওয়ার উপলব্ধির সামনে দাড়িয়ে আমি হাতড়াতে থাকি জীবনের সম্বল। জাগতিক সবকিছুই যে চলে যাওয়ার সময় অর্থহীন তা বুঝি কিন্তু মোহ, মায়ার কারণে মেনে চলতে পারি না। আমি চলে গেলে থেমে যাবে আমার ক্ষুধা , এলোমেলো কিছু ভাবনা, বন্ধুদের সাথে উড়াউড়ির দিনগুলো এবং মাছ ধরার শখটাও। আরও থামবে খুবই সস্তা কিছু স্বপ্ন যা সবারই থাকে- ছবির মতো সুন্দর একটি বাড়ি, দামী একটি গাড়ি আর অনিন্দ্য সুন্দর পৃথিবীটা ঘুরে দেখার স্বপ্নটা। আমি চলে গেলে এই পৃথিবীর কিছুই আসবে যাবে না। আমার প্রিয় মুখগুলো সাময়িক কষ্ট পাবে হয়তো। কিন্তু ঠিকই তারা গুছিয়ে নেবে, এগিয়ে যাবে। আর কালেভদ্রে পরিবার কিংবা বন্ধুদের মিলনমেলায় দু-একটি আবেগঘন স্মৃতিচারণ। কবরে মাঝেসাঝে আপনজনের দোয়া দরুদপাঠ।জন্মদিন আর মৃত্যুদিন দুটোই কিন্তু সত্যি মাঝের সুখ-দুঃখ , আনন্দ-বেদনা , হাসি-কান্না , প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এগুলো সবই বেঁচে থাকা প্রতিটি প্রাণের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। সময়ের ঘড়িটা চলছে খুব দ্রুত। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত , জেনে কিংবা না জেনে , কথায় , কাজে , ব্যবহারে অনেক ভুল করেছি এক জীবনে। এসব ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া হয়নি সময়ের অভাবে। সেই সুযোগ হয়তো না-ও পেতে পারি তাই আজ চেয়ে নিচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে প্রিয় বন্ধু.. প্রিয় সহযাত্রী.. প্রিয় পাঠক..যারা আমার জন্মের দিন সম্বন্ধে অবগত হয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ব্যস্ততার জন্য যারা জানাতে পারেননি সবাইকে এক সমুদ্র ভালোবাসা। আজকের এই দিনে আপনাদের আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ। কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা সবাইকে।

#ওহিদুল_আলম_পিটু
২১ _০১_২০২১

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত