মঙ্গলবার, মার্চ ২৪, ২০২৬

সেলিম আল দীনের প্রয়ান দিবস: টুকরো স্মৃতি

আপডেট:

ডক্টর সেলিম আল দীনের প্রয়ান দিবস: টুকরো স্মৃতি…

// তানভীর আলাদিন //

বিজ্ঞাপন

শেকড় সন্ধানী নাট্যকার ডক্টর সেলিম আল দীনের আজ মহাপ্রয়ান দিবস। ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি রাজধানীর ল্যাব-এইড হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

সেলিম আল দীন ভাইয়ের সঙ্গে ছোট-ছোট অনেক স্মৃতি রয়েছে আমার। এর মধ্যে থেকে একটু স্মৃতিচারণ:

বিজ্ঞাপন

স্মৃতি (১):
মহাপ্রয়ানের বছর খানেক আগে একদিন আপনি (সেলিম আল দীন) হাসতে-হাসতেই আমাকে বলেছিলেন- “দেশের অনেক জায়গায় আমার জন্মদিন উদযাপন করেন অনেকে, কিন্তু তোরা আমার নিজের জেলা ফেনীতে কখনো করলিনা, তোরা ডাকলে হয়তো আমি ঠিক্ যেতাম।”
আমি বলেছিলাম, ভাইয়া আমিতো ফেনীতে থাকি না আজ বেশ ক’বছর হলো।
বললেন, সেতো আমি জানিরে, এম্নি কথার কথা বললাম আর কি। তারপর আর…।

স্মৃতি (২):
দিন-দিন আমার মুটিয়ে যাওয়াটা সেলিম ভাই মোটেও পছন্দ করতেন না। ফেনী থিয়েটারের তৎকালীন সমন্বয়ক সচিব সুমন মাহমুদকে নিয়ে গেলাম তাঁর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যায়ের বাসভবনে। এই কথা সেই কথার ফাঁকে হঠাৎ তিনি সুমন মাহমুদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন- সুমন চোখ-কান খোলা রাখিসতো, যদি পুরাণা পল্টনের দিকে বিকট কোনো শব্দ শুনিস তাহলে কোনো গাড়ির ট্রায়ার পাংচার হয়েছে ভাবার কারণ নাই, কারণ ওটা তানভীর আলাদিন বিষ্ফোলণ হওয়ার আওয়াজ। দেখছিস না সে কীভাবে প্রতিদিন মুটিয়ে যাচ্ছে।

স্মৃতি (৩):
ফেনীর বিজয় সিংহ পাড়ে এক বিকেলে আমি, সেলিম ভাই আর তার ব্যক্তিগত সহকারি(নামটা লেখলাম না) বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, বাদাম কিনে খেতে-খেতে তিনি বাদামের উপকারিতা নিয়ে এক লম্বা লেকচার দিলেন। শেষে বললেন- বাদামে উপকার ছাড়া অপকার নাই। তাঁর সহকারি হাসতে-হাসতে বললেন- স্যার অপকারিতাও আছে- আপনি ডায়েরিয়া হলে বাদাম খেয়ে দেখবেন কী হয়। তিনি মৃদু হাস্যবদনে বললেন- দেখেছিস বেটার পঁচা কথা, মনোরম বিকেলের আড্ডায় ডায়েরিয়ার মতো এটা পঁচা শব্দ টেনে এনে মজাটাই নষ্ট করে দিলো। এজন্যে তোকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। তখন তার তার সহকারির শাস্তি হয়েছিলো পুরো বিজয়সিংহ দীঘির চারিদিকে একবার চক্কর দিয়ে আসা।

সেলিম ভাই, আজ আপনার জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবস দেশের বিভিন্ন জেলার মতো আপনার জন্মস্থান ফেনীতেও এখন পালন করতে দেখা যায়। আজ আপনার প্রয়ান দিবসে দোয়া করি, বিধাতা যেনো আপনাকে ওখানে ভালো রাখেন, অনেক ভালো।

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনকে এই প্রজন্মের পাঠকদের সামনে একটু তুলে ধরছি:

ফেনী জেলার সোনাগাজীর সেনেরখিল গ্রামে ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ঔপনিবেশিক সাহিত্য ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটককে আবহমান বাংলার গতিধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকে বিষয়, আঙ্গিক আর ভাষা নিয়ে গবেষণা ও নাটকে তার প্রতিফলন তুলে ধরেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলা নাটকের যে আন্দোলন, তার পেছনেও রয়েছে সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শেকড়ের সন্ধানে মগ্ন ছিলেন। ফিরোজা খাতুন ও মফিজউদ্দিন আহমেদ দম্পতির তৃতীয় সন্তান তিনি। ফেনীতে জন্ম হলেও বাবার চাকরির সূত্রে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটক নিয়ে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন সেলিম আল দীন। ওই বিভাগ থেকেই তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো নাটক বিষয়ক পত্রিকা ‘থিয়েটার স্টাডিজ’। নাট্যচর্চার জন্য ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠাতেও ভূমিকা ছিল তার। পরে সারাদেশে নাট্যআন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে ১৯৮১-৮২ সালে আরেক নাট্যযোদ্ধা নাসিরউদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। নাটক রচনার পাশাপাশি নাটক নিয়ে তিনি গবেষণা চালিয়ে গেছেন আজীবন। বাংলা ভাষার নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ ‘বাংলা নাট্যকোষ’ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন তিনি নিজেই। তার রচিত ‘হরগজ’ নাটকটি সুয়েডীয় ভাষায় অনূদিত হয় এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় মঞ্চায়ন করেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক এথনিক থিয়েটারেরও উদ্ভাবনকারী তিনিই। সেলিম আল দীনের লেখা নাটকের মধ্যে ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘শকুন্তলা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘হাতহদাই’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘পুত্র’, ‘বনপাংশুল’ উল্লেখযোগ্য। ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে তার গবেষণাধর্মী নির্দেশনা ‘মহুয়া’ ও ‘দেওয়ানা মদিনা’। তার রচিত ‘চাকা’ ও ‘কীত্তনখোলা’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ও জাতীয় চলচ্চিত্র পরষ্কার প্রাপ্ত ডক্টর সেলিম আল দীন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন । জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মসজিদের কাছে তাকে সমাহিত করা হয়।

• তানভীর আলাদিন
সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত