শব্দদূষণ, এক নীরব ঘাতক
========================
অ্যাডভোকেট ফয়েজুর রহমান
কিছুদিন আগের ঘটনা৷ ঢাকার শ্যামলীতে ১০ তলা ভবনের ছাদে একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে গান বাজানো হচ্ছিল৷ সেই ভবনের ৯ম তলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন (৬৫) একজন হৃদরোগী, যাঁর বাইপাস সার্জারি হয়েছে৷ তার ছেলে সাইফুল কয়েকবার গিয়ে রোগীর অসুবিধার কথা জানালেও যারা গান বাজাচ্ছিল, তারা শোনেনি৷ গান বাজানোর প্রতিবাদ করায় পরদিন সকালে সাইফুলকে কে ডেকে নিয়ে মারধোর করে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল গণি ৷ গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি ছিল তার ভাইয়ের ছেলের৷ ছেলেকে মারধোরের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা জয়নাল আবেদীন এবং পরে মারা যান৷ এই ঘটনার পর পুলিশ শফিকুল গণি সহ চারজনকে আটক করেছে৷ এ তো গেলো মাত্র একটা ঘটনা৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাফিয়া সুলতানার অভিজ্ঞতা :– তিনি বলেন, ‘আমি উত্তরা থেকে ক্যাম্পাসে আসি। জ্যামের পাশাপাশি অতিরিক্ত শব্দের কারণে মাথাব্যাথা করে। ক্যাম্পাসে আসতে আসতেই অনেকটা সেন্সলেস অবস্থা। ক্লাসে মন বসে না, কিছুই ভালো লাগে না, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অনেক সময়ে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি তখন কমন রুমে শুয়ে পড়ি।
বিজয় সরণিতে কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জন জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘আমরা যারা ট্রাফিকে কাজ করছি শব্দদূষণের ফলে আমাদের প্রতিনিয়ত শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে। ডিউটি শেষে যখন বাসায় ফিরি তখন মনে হয় গাড়ির শব্দই শুনছি। বাসায় গিয়ে কখনো মনে হয় না শান্ত পরিবেশে আছি। আমাদের অনেকের কানে সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
উচ্চমাত্রার শব্দদূষণের পরিনতি :–
স্বাভাবিক শ্রবণ ক্ষমতা প্রতিনিয়তই হারিয়ে ফেলছে শহরবাসী। সড়কে হর্ন বাজানোর তীব্র প্রতিযোগিতা চলছেই। মানুষের সহন ক্ষমতার দুই থেকে তিনগুণ বেশি শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে এখানে। ফলে, নানা রকম শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছে মানুষ।
উচ্চমাত্রার শব্দদূষণের ফলে, মাথা ধরা, শারীরিক অবসাদ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, শ্রবণ শক্তি হ্রাসসহ ৩০টিরও অধিক কঠিন রোগের সৃষ্টি হয়। এতে আক্রান্তের ঝুঁকির তালিকায় এগিয়ে থাকে শিশু, বৃদ্ধ, বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা।
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক ফরিদ উদ্দিন এর মতে , অতিমাত্রায় শব্দ দূষণের ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্ত চাপ, হৃদযন্ত্রের কম্পন বৃদ্ধি, হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত, মাংসপেশির খিঁচুনি এমনকি শিশুদের বেড়ে ওঠাকেও বাধাগ্রস্ত করে। এর জন্য রাস্তায় গাড়িচালকদের বেপরোয়া, বেহিসেবি ও অহেতুক হর্ন বাজানোর প্রবণতাই দায়ী।
উচ্চ আওয়াজের ক্ষতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নাক, কান ও গলা বিভাগের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান তরফদার বলেন, ‘কেউ যদি ক্রমাগত সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় শব্দ শুনতে থাকে, তাহলে একপর্যায়ে আংশিক; পরে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি লোপ পেতে পারে। এমনকি প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে হেডফোনে গান শুনলে
পাঁচ বছরের মধ্যেই শ্রবণক্ষমতা কমতে থাকবে। তাহলে রাস্তার উচ্চ শব্দে কী ক্ষতি হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।’
শব্দের স্বাভাবিক মাত্রা :–
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবেল।
শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল।
হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে।
পরিবেশ অধিদফতরের জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি।
শব্দদূষণের মূল কারণ :–
সাধারণভাবে যানবাহন ও হর্নের শব্দই শব্দদূষণের মূল কারণ৷ তবে এর বাইরে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার আর একটি বড় কারণ৷ যদি আমরা ইনডোর শব্দ দূষণের দিকটি বিবেচনায় নেই তাহলে টাইলস লাগানো, মিউজিক সিস্টেমে জোরে গান বাজানো, এগুলোর শব্দ রয়েছে৷
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন :–
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়৷ বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে৷
আইন ভঙ্গ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা শব্দের উৎস যন্ত্রপাতি জব্দ করতে পারবেন। বিধিমালায় যেসব উল্লেখ করা রয়েছে তা পালনে ব্যর্থতাকে অপরাধ হিসেবে ধরা হবে।
শব্দ দূষণে দোষী হিসেবে প্রমাণিত হলে প্রথম অপরাধের জন্য একমাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দু ধরনের দণ্ডই প্রদান করার বিধান রয়েছে।
দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়ার কথা বলা রয়েছে।
আপনি শব্দ দূষণের শিকার এমন মনে হলে টেলিফোনে, লিখিত অথবা মৌখিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন।
ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মারুফ হাসান জানান,
‘‘আইনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ আরো কিছু বিষয়ে ব্যতিক্রম আছে৷ তবে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টা এবং রাত ১০টার পর কোনোভাবেই উচ্চ শব্দের কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না৷ পুলিশের স্বপ্রণোদিত হয়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার আছে৷ আর পাবলিক প্লেসে অনুষ্ঠানের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে৷”
আইন মানায় অনীহা কেন?
পরিবেশ বিষয়ক আইনজীবীদের সংগঠন বেলার নির্বাহী কমিটির একজন সদস্যের মতে,
“মানুষের আইন মানার অনীহা তখন তৈরি হয় যখন সে দেখে যে অপরাধ করলে, (যেমন :- রাতের বেলা নির্মাণ কাজ করলে) কোন কিছু হয় না। আইন প্রয়োগ না হওয়াটা যখন সমাজের মানুষ দেখতে পায় তখন তারা শব্দ দূষণ বা অন্য কোন অন্যায় করাটা স্বাভাবিক মনে করে।”
একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “যেমন ঢাকায় ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে যখন কেউ প্রবেশ করে, সকল গাড়ির চালক কিন্তু সব নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাইরে গিয়ে একই বিষয় মেনে চলেনা। এর কারন কি ?”
“কারণ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ হয় বলে মানুষের মধ্যে ভীতিটা তৈরি হয়েছে।”
অন্যের সমস্যায় সম্মানের অভাব :-
বাংলাদেশে শব্দ দূষণের জন্য রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে, শিল্পপতি সকলেই কমবেশি দায়ী বলে মনে করেন শব্দ দূষণ ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এরকম সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল মতিন।
তিনি বলছেন, “অন্যের সমস্যার প্রতি আমাদের সম্মানের মারাত্মক অভাব রয়েছে। অন্যের সমস্যাকে সম্মান না করার কারণে একটি ছোট সমস্যা বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে। সেটি বোঝা, আমাদের নাগরিকদের দায়িত্বশীলতার মধ্যে পড়ে । সেই বোধ কম রয়েছে বলে আমি মনে করি। মানুষ চাইলেই সবকিছু পরিবর্তন করতে পারে।”
তিনি মনে করেন, “ সমাজের উপরের দিকের লোক, যারা শিল্পপতি, ধনীব্যক্তি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক দিয়ে যারা ক্ষমতাশালী তারা যখন এধরনের শব্দ দূষণ ও পরিবেশের মতো বিষয়কে অগ্রাহ্য করেন তখন সাধারণ মানুষও সেটিই অনুসরণ করে।”
পরিশেষে যে বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো শব্দদূষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা । সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে পারে । সচেতনতামূলক এই প্রচারে নিন্মোক্ত বিষয় থাকতে পারে:–
ঘন ঘন এবং অযথা গাড়ির হর্ন বাজাতে নিষেধ করা। লাউডস্পিকারের ব্যবহার করতে নিষেধ করা। হাইড্রোলিক হর্ন তথা উচ্চমাত্রার হর্ন এর ব্যবহার বন্ধ করতে বলা । বিয়ে বাড়ির শোভাযাত্রায় ব্যান্ড বাজানো, পটকা ফাটানো বন্ধ করতে বলা । সবাইকে শব্দ দূষণ সংক্রান্ত আইন মেনে চলার কথা বলা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে যে সরকারি ও বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে উচ্চমাত্রার হর্ন বাজবে না। এভাবেই সচেতনতা শুরু হবে। এখনই শব্দের উচ্চ মাত্রা কমানো না গেলে এই নীরব ঘাতক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষম মানুষকেও ধীরে ধীরে বার্ধক্যে পরিণত করবে।
==================
লেখকঃ অ্যাডভোকেট, এ পি পি , জজ কোর্ট ,ফেনী।
Email : faizurlaw9@gmail.com



