কবি ও জিজ্ঞাসা
মিজানুর রহমান, অক্সফোর্ড
পৃথিবীতে ‘সফলতা’, ‘অনুসন্ধান’, ‘প্রশ্ন’, ‘জিজ্ঞাসা’, ‘ইচ্ছা-অনিচ্ছা’ ইত্যাদি শব্দগুলো শুধুমাত্র আলাদা নয়, শুনতেও বিচিত্র, এবং আজব আজব অর্থ বহন করে। জীবনদর্শনে নতুন উদ্যমে কোনকিছুর উদ্যোগ নেওয়ার যেমন শেষ নেই, তেমনি এ শব্দগুলোর বিস্তৃতির শেষ নেই, এমনকি সফলতারও শেষ নেই। মানবজীবনে কত কী করার আছে, কত কাজ বাকি, কত সিঁড়ি ভাঙতে হবে তারও যেমন সীমানা নেই, তেমনি প্রশংসারও কোন পরিমাপ নেই। কত নমস্কার, কত প্রণতি, কতশত প্রশংসার ফুলঝুরি! হাজারো নাম না জানা শুভেচ্ছা শুভকামনা। প্রকারান্তরে, কিছু তার ভালো লাগা আর কিছু- সৌন্দর্য সৌজন্যতা। শুধু শুধু কৃত্রিমতায় ভরা এই আনন্দ আর ভণিতায় ভরা নমস্কার। জানি, এ কখনও বন্ধ হওয়ার নয় কখনও ফুরোবার নয়। এই আচার এ ব্যবহার, কাঁটা-চামচ আর সাহেবী খাতিরে মন ভরে না। কেবলি মনে হয়, তেপান্তরের মাঝে এ শুধু অন্তহীন অসাড় বাক্যালাপ। তপ্ত মরুর বুকে পড়ে থাকা অর্ধমৃত বেদুইন, যাকে চৈতন্যে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা! মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসে অক্সিজেন ঢেলে- প্রাথমিক প্রার্থনা। তেষ্টা মেটানোর আশ্বাসে রচনা ধুসর পান্ডুলিপির একফোঁটা পরিতৃপ্তি। যদি লাল আভা ছেয়ে যায়! যদি কৃষ্ণচুড়ায় দেখা দেয় রক্তাক্ত রঙিন সমারোহ! জানি, পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবুও আশায় তবুও অপার অপেক্ষায়, যদি কখনও পূর্ন হয় শীতল জলের ধারায় শূন্যেতার তটরেখা।হঠাৎ দেখি তুমি, এলোমেলো কথাশুনে মনে হলো, পুরোনো হাবেলিতে বন্দী কোনো এক পাগলিনী। আলোহীন চারদেয়ালে বন্দি অস্পৃস্য কোনো কয়েদি। জানি, এড়িয়ে যাওয়াই সহজ ছিল। কিন্তু, তোমার সহজ সরল আবেগপ্রবণ শুভেচ্ছা আমাকে থমকে দিলো। জানতে ইচ্ছে হলো— প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি তোমার পূঁজনীয়’! হেসে হেসে পূঁজোর অর্ঘ্য দিলে। জবা ফুলে সজ্জিত থালায় হৃদপিন্ড করলে উৎসর্গ। ভালোবাসার আনুগত্যে জীবনটাকে তুচ্ছজ্ঞানে করলে সমার্পণ। এ কেমন ভক্তি! এ কেমন ভালোলাগা! মনে হলো, তুমি অকৃত্রিম! তুমি স্বচ্ছ! আমি যার অপেক্ষায় দীর্ঘদিন..।
কবির প্রয়োজন কলম আর কিছু কাগজ, সাথে একটা হৃদয়— স্পন্দিত অথবা ক্ষত-বিক্ষত। হোক তা রক্তাক্ত; হোক না হৃদয়বিদারক সংঘাতে জর্জরিত! কিংবা হোক চিত্ত থেকে জিহ্বা পর্যন্ত রক্তের লোহঝরা বেদনায় ভরা! অথবা হতে পারে চামেলি, জুঁই, ঝুমকো লতা। সাথে সাথে আলতো নরম ঘাসে বসে তারার সাথে কথা বলা। যেভাবেই হোক- উষ্ণতা চাই, অপরিহার্য ও তাই। কবি মানে উষ্ণতা, কবি মানে অনুভূতি, কবি মানেই প্রকাশ। আমি তো কবি নই, টুটোফুটো কুরসিতে বসা, কুড়িয়ে পাওয়া ময়লা কাগজের স্তূপ চারিধার। শুধু শুধুই জিহ্বায় উচ্চারিত সস্তা মূল্যের কিছুকথা, কিছু বাক্যালাপ। অস্ফুটতা থেকে পরিস্ফুটতা, বিচ্ছিন্নতা থেকে সংশ্লিষ্টতায় যাবার আপ্রাণ চেষ্টা। ভেতরে ভেতরে থাকে আকুল আকুতি। তোমাদের ভাষায় অসংলগ্ন অসঙ্গতিতে ভরা অর্থহীন প্রলাপ।
স্বর্গীয় প্রেম নারকীয় ঘৃণার সংজ্ঞা আমার জানা নেই। বাউলা পাগল আমি বুঝি শুধুই পাগলামি। কবিতার ডামাডোল বুঝিনা, আকাশভেদী প্রতিবাদ বুঝি। আমার জন্যে তাই হয়েছে কাল- মুখবিহীন কলমটা লাপাত্তা, প্রেমিকা হয়েছে বিরহী, মনের আকুলি বিকুলিতে লেখা ময়লা কাগজ গুলো- ছুড়ে ফেলেছে ভাগাড়ে।কী করে বুঝাই তারে! ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট আশা, ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, আবছা আলোয় বসে কাঁটা চামচ দিয়ে—আস্তে আস্তে জ্বলন্ত মাংসের টুকরোটোর উপর বলাৎকার করতে করতে ইনিয়ে বিনিয়ে, ধ্যাত! এ আমি পারবো না! কোনদিনই নয়! একটি অসম্পূর্ণ অসহ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতি। হায় রে শাশ্বত ভিখিরি! তুই অসহিষ্ণুতার দৈবরহস্যে বিশ্বাসী।কিন্তু, আমি যে পাগল। চিরতৃষাতুর দীন অন্তর আমার। তাই তো সরাসরি বলতে পারি—’তোমাকে ভালোবাসি’। দুঃখ ভরা এই জীর্ণশীর্ণ স্বরূপের বিচিত্র জীবনে; তাই আমি বখাটে। যেদিকে তাকাই, দেখি শুধু করুণ অসহ্যতার হাতছানি, ফুরফুরে মেজাজে হাসছে মিথ্যে, অহরহ ঘটছে ভালোবাসার বলিদান। জানিনা কিসের দায়! কেনই বা প্রেমের অব্যক্ত প্রকাশ ও আবেগের অসঙ্গতি! কেন সত্য অর্জনে দ্রোহ আজ দোদুল্যমান। কেন পরাভবে করছে আত্মসমার্পন! কেনই বা বুদ্ধিবৃত্তি আজ শক্তিহীন বেআব্রু, মোহগ্রস্থ, আস্তাহীন ও নিঃসঙ্গ! কেনই বা বিপ্লব আজ প্রাণশক্তিহীন প্রতীক্ষা! বিশুদ্ধ অন্তর আজ মুখোশ পরা!
প্রেম আর বিপ্লব একসাথে? অসম্ভব! ভুলের স্বর্গে বসবাস! বিশ্বাস না হয় কবিকে জিজ্ঞেস করো। একটা কলম আর কিছু কাগজ এনে লিখতে বলো, ‘স্বাধীনতার জন্যে রক্ত চাই— নাকি চোখের পানি’? প্রেমিকের জন্যে কী চাই? মিথ্যে বুলি, নাকি— ‘শব্দহীন হও, বাক্যহীন হও, তবু মিথ্যাবাদী হইও না’।
সুত্র ফেইসবুক
—


