বুধবার, মার্চ ১৮, ২০২৬

বাজেট এইবার শিক্ষা ক্ষাত অবহেলিত

আপডেট:

বাজেট ঘোষণায় ভালো-মন্দ উভয় দিক থাকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চাপের সম্মুখীন হলেও প্রাজ্ঞ ও সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও গতিধারা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় দেশের সার্বিক ক্ষতি হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংকট আমাদের নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাবিত করছে। সেজন্য সংকটে বাজেট দেওয়া কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। নানামুখী চ্যালেঞ্জিংয়ের মধ্যে সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। জনগণের প্রত্যাশার বাজেট হলো কিনা তা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে। অনেকেই বলেছেন যে, বাজেট বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। সর্বজনীন পেনশন সরকারি সব কর্মচারীর জন্য চালু করা হবে এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সর্বজনীন পেনশনে কেউ যেন বৈষম্যের শিকার না হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য বিশেষজ্ঞরা অনেক বছর ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। এবারের বাজেটেও তার প্রতিফলন হয়নি। অংকের হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে। বাস্তবে বাড়েনি, বাজেটে শিক্ষা খাতে উন্নয়নের জন্য তেমন কোনো সুখবর নেই মনে হচ্ছে। বাজেট যতটা ব্যবসা উপযোগী, ততটা শিক্ষাবান্ধব নয়। টেকসই উন্নয়নের লক্ষে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ করবে এ রকম সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল। তা এখনও রক্ষা হয়নি। শিক্ষা ও প্রযুক্তি মিলে একটি খাতে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা হওয়া উচিত নয়। দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষাকে পৃথকভাবে মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা খাতে যে বাজেট ঘোষণা করা হয় তা আসলেই গতানুগতিক। এখানে নতুনত্ব আনা জরুরি। যত কিছুই করি না কেন, শিক্ষার মান উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব না। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ না করলে সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৯৪,৭১০ কোটি টাকা। যদিও টাকার অংকে গতবারের বাজেটের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জিডিপি অনুসারে বরাদ্দ কমেছে। কারণ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আছে বর্তমান অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ যা গত বছরে ছিল ১.৭৬ শতাংশ। যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১.৮৩ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকার কথা। অর্থাৎ সংশোধিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষায় বরাদ্দ কোনো খরচ নয়, বরং বিশাল বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে। যেসব দেশ এটা বুঝতে পেরেছে, সেসব দেশ বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা সহায়ক সমাজ গড়ে তুলতে হলে সময়োপযোগী শিক্ষা প্রদান করতে হবে। এজন্য দরকার শিক্ষা বা গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। যার সুফল পাবে জনগণ।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিউএস ২০তম সংস্করণে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং ২০২৪ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকার শীর্ষ পাঁচশর মধ্যে স্থান পায়নি। তবে এবার বেশি হতাশ হতে হয়েছে, যখন এশিয়ার র‌্যাংকিং প্রকাশ পায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক টাইমস হায়ার এডুকেশনের ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০২৪ প্রকাশিত হয় গত ৩০ এপ্রিল। এশিয়ার ৩১টি দেশের মোট ৭৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে করা তালিকায় শীর্ষ তিনশতে নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম। বরাদ্দ কম মানে গবেষণা এবং শিক্ষার গুণগত মানও কম। তাই এই র‌্যাংকিংয়ে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থান পায় না। এসব প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে পরিকল্পনা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। এই পদক্ষেপের মধ্যে শিক্ষা খাতে পৃথকভাবে মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। বরাদ্দ দিলেই হবে না, কার্যকর ব্যবহার করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এই র‌্যাংকিংয়ে যেসব সূচক বিবেচনা করা হয় তার মধ্যে একাডেমিক খ্যাতি এবং গবেষণা (৬০% স্কোর) অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ। সূচকের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণার মান বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক খ্যাতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। গত কয়েক বছর উচ্চশিক্ষায় অনেক উন্নয়ন হলেও গবেষণা তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি। গবেষণা খাতে আমাদের আর্থিক বরাদ্দ যথেষ্ট না থাকলেও গবেষণা হয়, কিন্তু সেটা আন্তর্জাতিক মানে জায়গা করে নেওয়ার মতো যথেষ্ট না। তাই বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের অনেক সহকর্মীর লেখা বা গবেষণা ভালো জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু আগ্রহী শিক্ষকদের জন্য গবেষণায় তেমন কোনো প্রণোদনা নেই। আমাদের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষায় গবেষণার ওপর জোর দেওয়া উচিত। সেজন্য শিক্ষকদের আর্থিক গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং আর্থিক প্রণোদনার কিছু নীতি থাকা জরুরি। যেমনÑ একাডেমিক গবেষণার ক্ষেত্রে, অনেক চীনা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের জন্য বড় নগদ বোনাস অফার করে যারা শীর্ষস্থানীয় একাডেমিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে, যা একজন চীনা গবেষকের মোট বেতন বৃদ্ধি করতে পারে।

এছাড়াও ভারতে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষক বা অধ্যাপকের বাসস্থানের জন্য পুরো বিল্ডিং বরাদ্দ থাকে যেখানে তারা ফ্রি বা খুবই কম ভাড়ায় থাকতে পারে। অন্যদিকে, শ্রীলংকায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিজ্ঞপ্তিতে দেখতে পাই প্রত্যেক শিক্ষক তার মূল বেতনের ৩৫% গবেষণা ভাতা পাবেন। তবে আমাদের দেশে সরকারের অর্থায়নে বিদেশে অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে যারা শিক্ষা বা গবেষণার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরকারের বিভিন্ন ফেলোশিপের মাধ্যমে বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার সুযোগ করে দেওয়া খুবই জরুরি। গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে নানামুখী পলিসি নিয়ে থাকে। গবেষণাই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে পারে। তাই আমাদের দেশে এরকম কিছু নীতি থাকলে অবশ্যই ভালো গবেষণার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১১.৫৭ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১২.১ শতাংশ। এই হিসেবে এবার জাতীয় বাজেটের প্রায় ১১ শতাংশ ৮৮ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ যা গত বছর থেকে বেড়েছে তবে তার আগের অর্থবছরের তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইউনেস্কোর শিক্ষা দলিলে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে মোট বাজেটের ২০-২৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিলে দেশের গবেষণা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে। বিশ্বের যেসব দেশে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে কম বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বনিম্ন। প্রতিবেশী নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপ শিক্ষা খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে।

উচ্চশিক্ষা টেকসই উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে যদি গবেষণায় বরাদ্দ বেশি থাকে এবং সেই অনুসারে শিক্ষকগণ মানসম্মত গবেষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আসবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব, যারা তাদের সৃজনশীল চিন্তা, মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উল্লেখ্য যে, মনে থাকার কথা। যেমনÑ অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনাভাইরাসের টেস্ট কিট বা প্রতিষেধক আবিষ্কারের গবেষণা করেছিল, তখন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনা মোকাবেলায় তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। কারণ গবেষণার সরঞ্জামাদির অভাব এবং আর্থিক বরাদ্দ কম থাকা। তাই সরকারকে এ বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য জোর অনুরোধ করছি। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমন করে গড়তে হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির উৎস হয় এবং এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নিয়মিত মূল্যায়ন এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দের মাধ্যমে গবেষণার বিবর্তনে শক্তিশালী প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।

ড. শফিকুল ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত