সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি ও হা–মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ এমপি বলেছেন, সৎভাবে আয় করে একজনকে ৩০ শতাংশ কর দিতে হবে। আর কালোবাজারি, অবৈধ টাকা, যার উৎস খোঁজা হবে না সে দেবে ১৫ শতাংশ। এটা হতে পারে না। আমি একজন সংসদ সদস্য, এরকম তুঘলকি কাণ্ডের ওপর সমর্থন জানানোর জন্য জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দেয়নি। এটা বাতিলের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সংসদে তুলবো।
সোমবার সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট’ শীর্ষক আলোচনায় এমন মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে এ. কে. আজাদ বলেন, ৩৮ লাখ টাকার বেশি আয় হলে এতোদিন ২৫ শতাংশ কর দিতো হতো। এবার দিতে হবে ৩০ শতাংশ। ঠিক আছে আমি দেবো। আর ব্যাংক থেকে যিনি বিনিয়োগ করার জন্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য ঋণ নিলেন। তবে সেই ঋণের টাকা ব্যবসায় না খাটিয়ে বিদেশে নিয়ে কানাডা, মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনলেন। এখন তিনি যদি টাকা ফেরত আনেন তাকে কর দিতে হবে ১৫ শতাংশ। কোনোভাবেই এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। ওই কৃষক ঠিক মতো খাজনা দেন। অথচ উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়ার সময় আইন শৃংখলা বাহীনি ও বাস্তনা ব্যারিকেট দিয়ে টাকা আদায় করে। বাজারে বিক্রির সময় আবার খাজনা দিতে হয়। সে কোনো মাফা পায় না। মাফ পান যিনি এনবিআরের চেয়ারম্যানকে রিচ করতে পারছেন, হাজার–হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে যে শোধ করে না, পুনঃতপশিল করে তাকে রিচ করার জন্য এনবিআর বলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।
তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি। তাহলে দেশে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে। বাজেটে রাজস্ব আয়ের একটি উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছর রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সেখান থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মাঝেমধ্যে জনসম্মুখে বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে এবং এখনকার জনবল দিয়ে এই রাজস্ব আদায় করা সম্ভব না। তাহলে এই লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে তো লাভ নেই। রাজস্ব আদায় বাড়াতে আগামী বাজেটে এলইডি লাইট, মোটরসাইকেলের ওপর নিত্য ব্যবহারিত জিনিসের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। মাঝেমধ্যে দেখা যায় দুই বাচ্চা, স্ত্রীসহ চারজনে এক মটরসাইকেলে চড়েন। সেখানে কর বাড়ানো হলো। আবার ইউএনও, এসিল্যান্ডদের জন্য হাজার–হাজার কোটি টাকার গাড়ি আমদানি করা হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে তারা নিজেদের দেশের উৎপাদিত গাড়ি ব্যবহার করে। আবার কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা গাড়ি পাবেন তা নির্ধারণ করা আছে। যেখানে রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে সেখানে কেন সরকারের এতো পরিচালনা ব্যয় করতে হবে। এটা কমানো উচিত।
ফরিদপুর–৩ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এ এমপি বলেন, প্রকল্প ব্যয় কমাতে হবে। এজন্য যেসব প্রকল্পের ৮০ শতাংশ, ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে কেবল তা সম্পন্ন করতে হবে। নতুন করে ঋণ নিয়ে প্রকল্প করে করের বোঝা চাপানো ঠিক হবে না। আগামী অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আর সুদ পরিশোধে চলে যাবে এক লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আবার মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধর হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কীভাবে হবে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তিনি বলেন, যেখানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ শতাংম, আমদানি কমেছে, রপ্তানি চাপের মধ্যে আছে। সব মিলিয়ে আমি দেখি না মূল্যস্ফীতি কমবে। সরকার স্থানীয় ব্যাংক থেকে আরও ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা আর ঋণ নিতে পারবে না। আর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিলে টাকা ছাপাতে হবে। তাহলে কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে।
এ. কে. আজাদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। তবেোর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলামের মতে এটা ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি। অনেক ব্যাংক খেলাপি দেখালে প্রভিশন করতে হবে। তখন আর লভ্যাংশ দিতে পারবে না এই কারণে খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করে। তিনি বলেন, সব পর্যায়ে জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে হবে। পত্রিকায় দেখা যায় বিশেষ ব্যবস্থায় গভর্নর বিভিন্ন অনুমোদন দেন। মূল্যধনী যন্ত্রপাতি আসছে না, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হচ্ছে না, বিনিয়োগ কম হচ্ছে এ বিষয়ে বাজেটে নজর দিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গবেষণ প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং দৈনকি যুগান্তরের প্রকাশক সালমা ইসলাম এমপি। সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি ষ্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।



