বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

ভারত ও বাংলাদেশ বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে গভীর দূরত্বে বলি মোস্তাফিজ

আপডেট:

ঢাকার তখনকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নিজেদের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ। ২০০০ সালের নভেম্বরের সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল ভারত-এতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ, বাংলাদেশকে টেস্ট খেলুড়ে দশম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল ভারতই।তৎকালীন আইসিসি সভাপতি জাগমোহন ডালমিয়ার প্রভাবেই ২০০০ সালের ২৬ জুন সর্বসম্মত ভোটে বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পায়। এর পেছনে মূল অনুঘটক ছিল ১৯৯৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারানো-যে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ প্রথমবার অংশ নেয় এবং পাকিস্তান ছিল শেষ পর্যন্ত ফাইনালিস্ট প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ভারতকে বেশ চাপে ফেলেছিল স্বাগতিকরা। যদিও শেষ পর্যন্ত নয় উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ, তবু লড়াকু মানসিকতা ও দক্ষতার ঝলক দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল-পাঁচ দিনের ক্রিকেটে তারা জায়গা হারায়নি। এরপরের পথচলা খুব দ্রুতগতির না হলেও, বাংলাদেশের ক্রিকেটে উজ্জ্বল মুহূর্তের অভাব হয়নি।দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সম্পর্ক দীর্ঘদিন মোটামুটি সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকলেও, রাজনৈতিক পরিবর্তন সেই সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে। একই সঙ্গে গত এক দশকে মাঠের লড়াইও হয়ে উঠেছে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে গভীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। গত বছরের আগস্টে সহিংস গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এরপর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারতের প্রতি আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। এ সময় বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ সামনে আসায় ভারত কূটনৈতিকভাবে কঠোর অসন্তোষ প্রকাশ করে।এই প্রেক্ষাপটেই আইপিএল ২০২৬ থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রত্যাহার করতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) বিসিসিআইয়ের নির্দেশকে দেখতে হবে। গত মাসে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত মিনি নিলামে মোস্তাফিজই ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি, যাকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ দেখা যায়। চেন্নাই সুপার কিংস ও দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে কেকেআর ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বাঁহাতি এই পেসারকে দলে নেয়।তখনই অবশ্য কিছু মহল থেকে কেকেআরের সহ-মালিক শাহরুখ খানকে লক্ষ্য করে সমালোচনা শুরু হয়-ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশি খেলোয়াড় নেওয়ার কারণে। পরিস্থিতি এরপর আরও খারাপের দিকে যাওয়ায় শনিবার বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে মোস্তাফিজকে ছাড়ার নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।এর ফলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হয়ে উঠল দ্বিতীয় দেশ, যাদের খেলোয়াড়রা (অন্তত আপাতত) আইপিএলে অনাকাঙ্ক্ষিত। ২০০৮ সালের প্রথম আইপিএলে শহীদ আফ্রিদি, মিসবাহ-উল-হক, সোহেল তানভির ও মোহাম্মদ আসিফসহ বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি ক্রিকেটার খেলেছিলেন। তবে ওই বছরের নভেম্বরে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। মোস্তাফিজ ইস্যু যদি ইঙ্গিত দেয়, তবে সেই নিষেধাজ্ঞার ছায়া বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের ওপরও পড়তে পারে।দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সম্পর্কের অবনতি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত জুলাইয়ে। তখন ঘোষণা দেওয়া হয়-পরের মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা ভারতের সাদা বলের বাংলাদেশ সফর (তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি–টোয়েন্টি) পিছিয়ে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নেওয়া হয়েছে। বিসিসিআই তখন এক বিবৃতিতে জানায়, দুই বোর্ডের আলোচনার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত।গত শুক্রবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সেই স্থগিত সফরের নতুন সূচি ঘোষণা করে-১, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর ওয়ানডে, আর ৯ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর টি–টোয়েন্টি ম্যাচ। তবে বিসিসিআই এখনো সফর নিয়ে মুখ খুলেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সফর আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ এবং ইউনূস সরকারের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগে ভারতের জনমনে ক্ষোভ স্পষ্ট।

আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের চাহিদা কখনোই খুব বেশি ছিল না। সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। বাঁহাতি অলরাউন্ডার সাকিব ৭১টি ম্যাচ খেলেছেন, যার বেশির ভাগই কেকেআরের হয়ে। মোস্তাফিজ ৬০ ম্যাচে নিয়েছেন ৬৫ উইকেট। ৩০ বছর বয়সী এই পেসারের জন্য হঠাৎ বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক হারানো নিঃসন্দেহে কঠিন বাস্তবতা। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়।
গত সেপ্টেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত টি–টোয়েন্টি এশিয়া কাপে ভারত স্পষ্ট করেই জানিয়েছিল-খেলাধুলা ও রাজনীতিকে আর আলাদা করে দেখা যাচ্ছে না। মোস্তাফিজ ইস্যু আসলে সেই অবস্থানেরই আরেকটি প্রতিফলন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত