চীন সফর শেষে দেশে ফিরছিলাম। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসছি খুব ছোট্ট বিমানে। আমার পাশে বসলেন একজন ভদ্রলোক। আমি সালাম দিলাম। উঠা নামা মিলে এক ঘন্টার সফর সঙ্গি। আমরা যারা বেঁচে আছি আমাদের কাছে এই একঘন্টা সময় কিছুই না। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক মানুষ এসেছে যাদের হায়াত এক ঘন্টারও কম ছিল। একটা মানুষের জীবন শুধু মাত্র এক ঘন্টা ভাবতে কেমন কেমন লাগে। সেই দিক থেকে আমরা অনেক ভাগ্যবান। আলহালদুলিল্লাহ। সে যাই হোক যে কথা বলতে যাচ্ছিলাম।আমার পাশের ভদ্রলোক যার কথা বলছিলাম। তিনি অনেক লম্বা সফর শেষে দেশে ফিরছেন। গিয়েছিলেন আমেরিকায়। ওনার সন্তানেরা ঐ দেশে লেখা পড়া করেন। তিনি পরিচয় দিলেন, তিনি একটি ব্যাংকের ডাইরেক্টর। ব্যবসায়ি আলাপ চলছিল। তিনি এক পর্যায়ে বললেন, বোখারী শরীফ খতম পড়িয়েছেন হুজুরদের মাধ্যমে। আমি বললাম কেন পড়িয়েছেন।
তিনি জবাব দিলেন, বরকতের জন্য, বিপদ মুক্তির জন্য।
আমি বললাম, আপনি ভুল করেছেন?
তিনি বললেন, কেন?
আমি বললাম, কেন নয়?
সবাই করাচ্ছে, সবাই বলছে, তাই আমিও পড়ালাম।
আমরা যারা ব্যবসা করি বিভিন্ন আইটেম নিয়ে, এই সব খতমগুলো কোরআন শরীফ খতম, বোখারী শরীফ খতম, গাউচিয়া খতম, যত খতম আছে সবগুলো টাকা আয় করার জন্য বিভিন্ন আইটেম। তিনি নড়ে চড়ে বসলেন। আমার মত দাড়ি ওয়ালা, টুপি ওয়ালা মানুষের নিকট এমন কথা আশা করেননি।
আমাকে বললেন, আপনি এইসব কি বলছেন?
আমি বললাম, আমাকে একটি হাদীস দেখাতে পারবেন যেখানে বলা হয়েছে পরীক্ষা পাশের এই খতম, বিপদ মুক্তির এই খতম, ব্যবসা লাভের আরেক খতম?
ভাই আমার জানা নেই, তিনি উত্তর দিলেন।
আমি আবার বললাম, হুজুরের পরিবারের কারো অসুখ হলে কোনদিন দেখেছেন কোন খতম পড়াতে?
না দেখিনি।এই সব খতম আমাদের জন্যে, হুজুরদের জন্যে না।এবার আসুন আপনাকে আরেকটি কথা বলি। আপনি যেহেতু একটি ব্যাংকের ডাইরেক্টর ব্যাংক দিয়ে বলি।আপনাদের ব্যাংকে প্রচুর লোক কর্মরত আছেন। তাদেরকে দুই ঈদে বোনাস দেন।বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট দেন। এখন প্রশ্ন হল, যে কর্মচারী বা কর্মকর্তা সারা বৎসর অফিসে আসে না, শুধু মাত্র বোনাস এবং ইনক্রিমেন্ট নেয়ার সময় অফিসে আসে তাকে কি বোনাস দেবেন? ইনক্রিমেন্ট দেবেন?প্রশ্নই আসে না।এই কোরআন শরীফ নাজিল হয়েছে জীবন কে শুদ্ধ পথে পরিচালনার জন্য, বিপদে পড়লে খতম পড়ানোর জন্য নয়। যারা জীবন কোরআন দিয়ে পরিচালিত, সেই প্রকৃত বোনাস পাবে। একবার চিন্তা করে দেখুন, কোরআনের যে আয়াতগুলো পিতা মাতার সেবা করার জন্য নাজিল হয়েছে, সেই আয়াতগুলো কি জন্যে নাজিল হয়েছে? পিতা মাতার সেবা করার জন্যে না কি পড়ে খতম করার জন্যে? তিনি কোন উত্তর দিচ্ছিলেন না। শুধু শুনে যাচ্ছেন।
আমি বললাম, রসুল সাঃ এর যুগে, সাহাবীদের যুগে, তাবেঈনদের যুগে বোখারী শরীফ ছিল না। অনেক পরে এই কিতাবে সহীহ হাদীস সংগ্রহ করা হয়। সুতরাং বিপদে এই বোখারী শরীফ খতম করলে বিপদ মুক্তি হবে এই আমল রসুল সাঃ থেকে আসেনি, সাহাবীদের থেকেও আসেনি, স্বয়ং ইমাম বোখারী রহঃ কখনো এই খতম নিজে করেননি, করার ফজিলত ও বয়ান করেন নি। তিনি সহীহ হাদীস এই জন্য সংগ্রহ করেছিলেন যে, ভেজালের সমুদ্র থেকে সহীহ হাদীসকে উদ্ধার করতে। যাতে মানুষ সহজে সহীহ হাদীস পায় এবং সঠিক পথে জীবন পরিচালনা করতে পারে।
অল্পক্ষনে আমাদের সময় শেষ হয়ে এল। উনার সাথে বেশী কথা বলতে পারলাম না বিমান থেকে নেমে বিদায় নিয়ে যে যার পথে চলে গেলাম।
বাসায় ফিরছি। গাড়ীতে বসে বসে ভাবছি। আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন। আমাদের একশ্রেনীর আলেমরা সেই সুদি ব্যাংকের লাভের জন্য বোখারী খতম করছেন আর টাকা আয় করছেন। মনে পড়ছে যখন দেশে ফখরুদ্দীন সরকার আসল। অবৈধ টাকার পাহাড় যাদের ছিল তাদের চোখে ঘুম ছিল না। কখন সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। এই অবৈধ টাকার মালিকেরা অনেকে বিদেশ চলে গিয়েছিল, দেশের মাঝেই আত্মগোপন করেছিল অনেকে। সেই সময় দেখেছিলাম হুজুরদের দৌড়। চারিদিকে খবর পাই বোখারী খতম হচ্ছে বোখারী খতম হচ্ছে। এক শ্রেনীর লোক অবৈধভাবে আয় করেছে, আরেক শ্রেনীর হুজুরের বোখারী খতম দিয়ে তাদের থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বোখারী খতম করতে অনেক টাকা দিতে হয় হুজুরদের। হায় বোখারী শরীফ, তোমাকে সবাই খতম করছে আর আয় করছে শুধু কাগজের টাকা, আমল করার ডাক কেউ দিচ্ছে না।
ফেইসবুক
– সংগৃহীত।
চীন সফল শেষে বিমানে✈ বোখারী শরীফ খতম
আপডেট:

