ঘৃণা (Hate)
মিজানুর রহমান, অক্সফোর্ড
ভালোবাসা ছুঁয়ে দেখা হয়নি কখনও, ছুঁয়ে দেখা হয়নি অভিমান। অনুরাগ যদি হয় উচ্ছিষ্ট জলখাবার; চেতনার ফানুস হয়ে উঠে টালমাটাল। ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে চাই ভালো অর্জন, সৌন্দর্যকে পেতে হলে চাই অর্থ, আর ঈর্ষা ও ঘৃণাকে পাওয়া জন্যে চাই যোগ্যতা।প্রারম্ভে স্বীকার করে নিচ্ছি, ভিন্ন মত ও পথ থাকতেই পারে। আলোকে জ্যোতি, প্রভা, দীপ্তি, কিরণ, যেকোন নামেই ডাকিনা কেন, অন্ধকারে কালো বিড়াল খুঁজে পাওয়ার মাধ্যম হলো আলো। তেমনি একটি শব্দ “ঘৃণা”। যত সুন্দর করেই সংজ্ঞায়িত করি না কেন, কাওকে অপছন্দ, অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা অথবা উপেক্ষা করার নাম ঘৃণা। যদিও শব্দটি শুনতেই কেমন যেন অসহ্য লাগে, কদর্য বা বাজে একটা ধারণা মনের মধ্যে আঁচড়ে পড়ে। অথচ ‘ঘৃণা’ সবসময় অনাকাঙ্খিত নয়, অমঙ্গলও নয় ! ঘৃণা থেকেই স্বাধীনতা, ঘৃণা থেকেই প্রেম, ঘৃণা থেকে গড়ে উঠে সঙ্গিন রঙিন ভালোবাসা। আবার ঘৃণা কখনও কখনও পরিবর্তনের শুভ সূচনা। যদি এভাবে বলি—আমায় একটু ঘৃণা দেবে, যে ঘৃণা অন্তরীক্ষে পীড়াদেবে, বিচারশক্তি পক্ষপাতে, অহেতুক আস্ফালনে, বর্নিত চর্চিত দাসত্বে, বিকৃত সত্ত্বা স্বরূপ অহংকারে!
আমায় একটু ঘৃণা দেবে, যে ঘৃণা জন্ম দেবে প্রীতিগীতি, অন্তরাত্মা উঠবে জ্বলে অগ্নিমূর্তি, কুন্ডলীতে পুড়বে জ্বলে পঙ্কিলতা! অসম-সংকল্প নির্লজ্জ বর্বরতা, বিষন্নতার প্রহর শেষে অনুকম্পা!—আমায় একটু ঘৃণা দেবে ? যে ঘৃণা অন্ধকারে উজ্জ্বলতার আলো দেবে, দীপ্তিআভায় পূর্ণ্যআত্মার জ্যোতি দেবে। নির্ভাবনার চাদর তলে দহনজ্বালা…. ইত্যাদি ইত্যাদি।কথাগুলো কবিগানের অংশবিশেষ অথবা যাত্রাপালায় বিবেকের তাড়না, কিংবা হতে পারে ভক্তিপদ দেবর্ষি নারদের ঢেঁকি কথন, ‘নারায়ণ’ ‘নারায়ণ’, ছলচাতুরীতে বলে যাওয়া অপ্রিয় সত্যবাণী। সে যাই হোক না কেন, এত আকুতিভরা কবিতা কিংবা ভক্তিবাণী শুনিয়ে ধৈর্য চ্যুতি ঘটাতে চাই না! আর ঘৃণাকারী একধরনের শত্রু, তার কাছে এভাবে চাইবোই বা কেন? সে তো আরও উৎসাহী হয়ে উঠবে! আর মনে মনে আমাকে দূর্বল মনে করবে! গায়ে পড়ে কেন কথা বলতে যাবো?লেখাটি শেষপর্যন্ত যদি পড়ার ধৈর্য্য থাকে— আমার বিশ্বাস, প্রত্যেক মানুষের মনে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রয়েছে ঘৃণা আর আবেগের সাথে জড়িত একজন মানুষ! একসময় যার সাথে জড়িয়ে ছিল গভীর আবেগ ও ভালোবাসা। যাদের ক্ষমা করতে পারলে মনে আত্মতৃপ্তি আসবে ভালো লাগবে। দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ ক্ষোভ উড়ে যাবে, মনের মধ্যে আসবে একধরনের প্রশান্তি! বিশেষ করে সেই মানুষগুলো— যাদের একজন ছিলো, শুদ্ধ সুন্দর পূজনীয়। যার একটি মারাত্মক ভুলে আপনি আহত। অথচ ঘৃণায় লজ্জায় দূরে সরে রয়েছেন।সেই মানুষটি, যে একদিন বলেছিলো, “চলোনা হারিয়ে যাই”। যে মানুষটি কথা দিয়ে কথা রাখেনি!
অথবা সেই মানুষটি, যার খুঁনশুটি ছিলো বিরক্তিকর, অথচ তার অনুপস্থিতিতে নেমে আসে গভীর শূন্যতা।
কিংবা সেই মানুষটি, যে একসময়ে প্রাণের বন্ধু ছিল। অভাব ও সামাজিক অবস্থানের কারণেই হয়তো পাশ কেটে গেলো। মনে হলো, এড়িয়ে গেল—না দেখার ভান করে। ক্ষোভে, ঘৃণায় যার সাথে এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।গভীর আকাঙ্ক্ষা এবং মধুর কল্পনাও একসময় এসে মারাত্মক ভাবে ঘৃণার জন্ম দেয়। এক সময়ে এসে বেমালুম ভুলে যায় যে, ঘৃণা করা সহজ ভালোবাসা কঠিন। যদিও অনেকের মতে, ঈর্ষাহীন সফলতা খুবই কঠিন এবং বিস্ময়কর। কথাটি সংকীর্ণ মানসিকতার প্রেক্ষাপট কিনা জানিনা, তবে কেবলই মনে হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসাবাসি, সর্বাধিক ঐক্য এবং সহমর্মিতা। যে ভালোবাসার আলোতে দুর্বলরা হবে আরও অধিক নিরাপদ এবং শক্তিশালীরা হয়ে উঠবে আরও অনেক অনেক বেশি ন্যায়পরায়ণ। যদিও নিজের সাথে বোঝাপড়াটাই আসল, ঘৃণা তৈরি করতে পারলেই প্রচারণা বেশি, আর প্রচারণা বেশি মানেই তড়িৎ সফলতা। কথাটি চরমসত্য, কিন্তু এমন ধারণা কলুষিত মনের ফসল।অবশ্য কখনো নিজের সাথে যাচাই করার সুযোগ হয়নি অথবা ইচ্ছেও করেনি। কেন এমন হলো? ঘুমানোর আগে আগে যদি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, সারাটা দিনে কতটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেছি, কতটা মিথ্যা বলেছি, নিজেই বুঝতে পারবো আমি এ সমাজে কতটুকু যোগ্য ব্যক্তিত্ব? কতবড় মাপের সহজ মানুষ? যোগ্য ব্যক্তিত্ব বা বড় মাপের সহজ মানুষ কোন পদবী নয়, একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ মানে, বেশিরভাগ মানুষ তাঁর ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসে, তাঁকে অনুসরণ করে, তাঁর কথায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর এই ব্যক্তিত্বের প্রধান লক্ষণই হচ্ছে- প্রেম ও বিনয়। সেই প্রেম এবং বিনয়ের দোহাই, বেশি বেশি মানুষকে ভালোবাসুন, ভালোবাসার কবিতা পড়ুন, দেখবেন মনটা তুলতুলে নরম, নিজের মধ্যে সবকিছু কেমন সহজ সরল হয়ে আসছে।ভালোবেসে বিকশিত হতে চাই, ঋষি মহামানব হতে চাইনা! একটি কলম আর কিছু কাগজ এনে দাও, জবানবন্দি লিখে যেতে চাই। করুণা চাইনা বিশ্বাস চাই! শর্ত সেঁটেছো আনন্দ পাঠে, ভগবান সেজে করো বাহাদুরী! কঠিন সত্যকে কবিতায় চাই। বার বার বলি, শতবার বলি, বিনীত বিনয়ে বিগলিত হই।পরিশেষে একজন বিখ্যাত মনিষী’র উক্তি দিয়ে ‘ঘৃণা’র ইতি টানতে চাই, আর তা হলো— “মানুষকে ঘৃণা করার অপরাধে কখনও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি, অথচ মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে অনেককেই হত্যা করা হয়েছে, প্রাণ দিতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে”

