মায়ের হাতের ছোঁয়া
ছোটবেলায় অসুস্থ হলে সারাক্ষণ মাকে ডাকতাম আর কোঁকাতাম। অসুখ হলেই মনে হতো মারা যাচ্ছি। বাতিকটা এখনো আছে। এখন মা নেই। তবু মাকে ডাকি। গত ২৫ মার্চ থেকে অসুস্থ। এর মধ্যে এক দিন শুধু ভালো বোধ করেছিলাম। গতকাল রাতে আবার জ্বর এলে মায়ের সেই হাতটি বড্ড মনে পড়েছিল। মা মারা গেছেন সতেরো বছর আগে। সেই হাতটি আমার কপালে ছোঁয়ানোর আগে মাকে নিম্নোক্ত কাজগুলো সারতে হতো। আমার মায়ের দিন শুরু হতো ফজরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে। এরপর কোরআন শরিফ পাঠ। চুলার বাসি ছাই পরিষ্কার। ঘরদোর উঠোন ঝাড়ু। মুরগির আধার তৈরি। খোঁয়াড় থেকে মুরগি ছাড়া। তারপর মা-বাবাসহ আট ভাইবোনের সকালের খাওয়া। সবাই পান্তা ভাত খেলেও আব্বার জন্য গরম ভাত থাকত। মেহমান কাজের লোকজন মিলিয়ে বারো-তেরোজন হয়ে যেত প্রতিবেলায়। সবার খাওয়া শেষে বাসনকোসন ধুয়ে রোদে শুকাতে হতো। সঙ্গে কাঁথা-বালিশও শুকাতে দিতেন। এর মধ্যে শুরু হয়ে যেত দুপুরের রান্নার জোগাড়যন্ত্র। প্রথমে লাকড়ি অথবা নাড়া এনে স্তূপ করা। মাছ থাকলে মাছ কুটা। শাকসবজি জোগাড়। সেগুলো বাড়ির উঠোনেই থাকত। মাঝেমধ্যে হলুদমরিচ বাটতে হতো। উঠোনে ধান শুকাতে দেওয়া। ঢেঁকিতে ধান বানা। ফাঁকে ফাঁকে উঠোনে শুকাতে দেওয়া ধান পা দিয়ে নেড়ে দেওয়া। তারপর খুঁচি দিয়ে সাড়ে তিন সের চাল মেপে নিয়ে সেগুলো ধুয়ে বিশাল ডেকচিতে ভাত রান্না। বর্তমানের প্রায় পাঁচ কেজি। তিন বেলার রান্না দুপুরেই সারতে হতো। রান্না হয়ে গেলে হাঁড়িপাতিল ঘরে রেখে গোসল করতে গিয়ে পরিবারের কাপড়চোপড় কেচে আনতেন।তারপর জোহরের নামাজ আদায়। নামাজ শেষে আমার পাশে বসে কপালে হাত দিতেন। শরীর শীতল হয়ে যেত। কপাল টিপে দিতেন। শরীর মুছিয়ে দিয়ে ভাত ও ওষুধ খাইয়ে দিতেন। সারা দিন কাজের জন্য আমার দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কম্পিউটারের গতিতে চলতে হতো তাঁকে। আরও অনেক অনেক কাজ থাকত। সেই শীতল হাতটি আজও খুঁজি। ঘুমের ঘোরে মাকে মাঝেমধ্যে দেখলেও মাথায় সেই শীতল হাতটির ছোঁয়া কখনো পেয়েছি কি না, মনে পড়ে না।

