এনামুল হক ঃ
মানবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় কোনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত লোভের যৌক্তিক পরিণতি। ইতিহাসের প্রতিটি পতনের কেন্দ্রে রয়েছে একটিই উপাদান—সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা। লোভ যখন ব্যক্তির চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন মানুষ আর স্বাধীন নৈতিক সত্তা থাকে না; সে পরিণত হয় প্রবৃত্তির অধীন এক নির্বিচার কার্যকরে।
পরিমিতিবোধ এই সংকটের মৌলিক প্রতিষেধক। এটি কোনো আবেগনির্ভর নৈতিকতা নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের এক পরিপক্ব কাঠামো। পরিমিতিবোধ মানে চাহিদা কমানো নয়; বরং চাহিদাকে যুক্তি ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে পরিচালিত করা। যে মানুষ এই সক্ষমতা অর্জন করে, সে লোভের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকে—লোভ তখন তার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে না।লোভের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—সে নিজেকে প্রয়োজনের ভাষায় উপস্থাপন করে। “আরেকটু হলেই নিরাপদ”, “এইটুকু না নিলে ক্ষতি হবে”—এই যুক্তিগুলো আসলে নৈতিক স্খলনের প্রথম সংকেত। একবার এই যুক্তি গ্রহণ করা হলে, পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো আর স্বাধীন থাকে না। পরিমিতিবোধ এই যুক্তিবাদের মুখোশ খুলে দেয় এবং মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়—এই আকাঙ্ক্ষা কি প্রয়োজন, না কেবল অভ্যাস?সমাজতাত্ত্বিকভাবে পরিমিতিবোধের অনুপস্থিতি ক্ল্যানিজম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক নৈতিকতার জন্ম দেয়। সম্পদের লোভ আত্মীয়তাকে অগ্রাধিকার দেয়, ক্ষমতার লোভ গোষ্ঠীর আশ্রয় খোঁজে, আর স্বীকৃতির লোভ বিবেককে নীরব করে। এই তিনটি প্রবণতা একত্রে সমাজকে ন্যায়বিচারহীন কাঠামোয় পরিণত করে। পরিমিতিবোধ এই কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত নৈতিক প্রতিরোধ।যে ব্যক্তি পরিমিত, সে ক্ষমতাকে লক্ষ্য নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখে। সে জানে—নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অর্জিত সাফল্য আসলে ব্যর্থতার অন্য নাম। তাই সে ত্বরিত লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়। এই অবস্থান ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে দিতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে তাকে অটল করে।তুমি চলে গেছো, কিন্তু এই মৌলিক সত্যটি রেখে গেছোলোভের সীমা নির্ধারণ না করতে পারলে মানুষ নিজেই নিজের পতনের স্থপতি হয়ে ওঠে।আর যে মানুষ নিজের ভেতরে সীমা টানতে পারে, সে বহিরাগত কোনো শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে না।পরিমিতিবোধ তাই কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক গুণ নয়; এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন। এটি সিদ্ধান্তকে ভারসাম্য দেয়, ক্ষমতাকে সংযত রাখে এবং সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী ন্যায়বোধের দিকে পরিচালিত করে। লোভ যেখানে নিয়ন্ত্রিত, সেখানে শাসন ন্যায্য হয়; আর ন্যায় যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে মানুষ সত্যিকার অর্থে স্বাধীন থাকে।লোভকে নিয়ন্ত্রণ করা মানেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা।আর যে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে,সে-ই শেষ পর্যন্ত সমাজের গতিপথ নির্ধারণ করে।

