বুধবার, মার্চ ৪, ২০২৬

বিলোনিয়া রেলপথ ও ফেনীর রেলওয়ের জায়গা কাদের দখলে

আপডেট:

উন্নত বিশ্বের প্রধানতম যোগাযোগ মাধ্যম রেলপথ। আর বাংলাদেশ রেলপথ সবচেয়ে অবহেলিত যোগাযোগ মাধ্যম। রেলওয়ের জায়াগা দখল করে স্থাপনা নির্মান চলে আসছে বহুকাল ধরে। অথচ রেল সম্পদ দেখাবার জন্য রেল পুলিশ রয়েছে। যাত্রী আর অবৈধ মাদক মাঝে মাঝে ধরা ছাড়া রেল পুলিশে কোন কাজ নেই।
ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথের স্টেশন ভবনগুলোয় আগাছা জন্মেছে। দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে চোরেরা। দীর্ঘ ২৫ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় অনেক স্থানে রেললাইন ও স্লিপার চুরি হয়ে গেছে। রেললাইনের পাশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা।ফেনী শহর থেকে পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্ত পর্যন্ত চলত একটি লোকাল ট্রেন, যা ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে বিলোনিয়া ট্রেন নামে পরিচিত ছিল। ফেনী থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত এ রেলস্টেশনের দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার। ১৯২৯ সালে নির্মিত ২৮ কিলোমিটারের এ রেলপথে বন্দুয়ার দৌলতপুর, আনন্দপুর, মুন্সিরহাটের পীরবক্স, নতুন মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, চিথলিয়া, পরশুরাম ও বিলোনিয়া নামে ৮টি স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল।একসময় রেলপথটি ছিল এলাকার শিক্ষা, ব্যবসাবাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম। বিভিন্ন অজুহাতে ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট রেল কর্তৃপক্ষ ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথটি বন্ধ করে দেয়। কর্মচারীদের বদলি করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকি না থাকায় প্রতিনিয়ত বিলোনিয়া রেললাইন দখল হতে চলেছে।
রেললাইনের ওপরে নির্মাণ হয়েছে ঘরবাড়িসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রেললাইনটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যারা আছে, তারা টাকাপয়সা নিয়ে স্থানীয়দের নানাভাবে রেললাইনটি ভোগদখলে সহযোগিতা করছে। বিশেষ করে মুন্সিরহাট বাজার ও ফুলগাজী বাজার এলাকায় সবচেয়ে বেশি রেললাইনের জায়গা দখল হয়েছে। উল্লেখ্য, বিলোনিয়া লাইনে ফেনী স্টেশনের পরের স্টেশনের নাম বন্দুয়া।এটি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়।বর্তমানে সেখানে স্টেশন বলতে ভাঙা, লতাপাতায় ঠাঁসা কয়েকটি ইটের দেয়াল কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এর পরের আনন্দপুর স্টেশনের অবস্থাও একই। স্টেশনগুলোর এক পাশে টিকিট ঘর, ওয়েটিং রুম, স্টেশন মাস্টারের ঘর সবই আছে। নেই শুধু মানুষের কোলাহল। দীর্ঘদিন অবহেলা আর অযতেœ থেকে সেগুলো এখন পরিত্যক্ত। এরই মধ্যে দখল হয়েছে ফেনী-বিলোনিয়া রেললাইনের সিংহভাগ অংশ। বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারি না থাকায় স্থানীয়রা যে যার মতো করে রেলের জায়গা দখল করে নির্মাণ করেছে বাড়িঘরসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফুলগাজীর বাসিন্দা বৃদ্ধ খায়েরেন নেছা বলেন, ‘এই রেলগাড়ি করে বাপের বাড়িতে যাইতাম, মাত্র দুই টাকা ভাড়ায় মুন্সিরহাট স্টেশন পর্যন্ত চলে যাইতে পারতাম। ’ যাতায়াত নিরাপদ ছিল বলেও জানান তিনি।
আনন্দপুর এলাকার কৃষক নুরুল হুদা জানান, ঝকঝক রেলগাড়ির শব্দ এখনো কানে বাজে। তবে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেলগাড়িতে করে আর যাওয়া-আসা হয় না। দিনদুপুরে অনেকেই রেলের স্লিপার চুরি করে, অনেকে দখল করে নিজের কাজে রেলের জায়গা ব্যবহার করছে বলে জানান তিনি। পরশুরামের বিলোনিয়ার ব্যবসায়ী আহাদ মিয়া বলেন, শুধু যাতায়াত নয়, ব্যবসায়িক কাজে এই রেলপথ এলাকার আমূল উন্নয়ন সাধন করেছিল। অবহেলায় রেললাইন আজ গল্পের পাতায় উঠবে বলে জানান তিনি। বদিউল আলম রকি নামে স্থানীয় এক শিক্ষার্থী বলে, ‘ছোট্টবেলায় দাদুর কাছে গল্প শুনতাম, এই রেলপথের বর্তমান করুণ অবস্থা দেখে খুবই খারাপ লাগছে। সংস্কার করে বিলোনিয়া রেলপথটি কর্তৃপক্ষ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলে অত্র অঞ্চলের মানুষ সুবিধা পাবে। ’ স্থানীয় বাসিন্দারা বর্তমানে আশাবাদী চালু হবে বিলোনিয়া ট্রেন। আবারও ঝকঝক শব্দ করে হুইসেল বাজিয়ে ফেনী থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটি পৌঁছাবে বিলোনিয়া স্টেশনে। স্থানীয়দের এমন অপেক্ষার প্রহর কি শেষ হবে, না কি এই অপেক্ষাটাই তৈরি হবে দীর্ঘশ্বাসে?

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত