ফেনী জেলার সকল উপজেলায় অনলাইন জুয়ায় আসক্ত অনেকে ভয়ংকর অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। সিএন জি চালাক থেকে শিক্ষক ব্যবসায়াই সবাই অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে, প্রতারণা, ছিনতাই মাদক কারবার,মাদকের বহনকারী হয়ে পড়েছে। মোবাইলের ছোট পর্দায় লোভনীয় বিজ্ঞাপন কৌতূহল জাগিয়ে তরুণদের অনলাইন জুয়ার জালে ফাঁসাচ্ছে। জেতার উত্তেজনা মুহূর্তের আনন্দ দেয়, কিন্তু পরবর্তী সময় সব হারানোর হতাশা পরিবার ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করছে। অনেক যুবক সংসারের টাকা খরচ করছে, ঋণের বোঝা সামলাতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নিচ্ছে।জুয়ার নেশা থেকে আত্মহত্যা : অনলাইন জুয়ায় হেরে যাওয়া অনেক যুবক মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। জুয়ার কারণে চুরি-ডাকাতির পাশাপাশি নিঃস্ব হয়ে হতাশায় আত্মহননের ঘটনাও ঘটছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী সদর উপজেলার অনলাইন জুয়ায় আসক্ত সোহাগ (২৮) গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। স্বজনরা বলছে, তিনি ধারদেনা করে জুয়া খেলে আসছিলেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবারও জুয়া খেলতে শুরু করেন। এরপর চাপে পড়ে আত্মহত্যা করেন।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের রিয়াজ হোসেন রাজ এমনই এক উদাহরণ। অনলাইন জুয়ার নেশায় বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। টাকার জোগান দিতে ব্যর্থ বাবা মোহাম্মদ আলী (৭০) ও মা বানোয়ারা বেগমকে (৬০) গত বৃহস্পতিবার হত্যার পর ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখেন। স্বজন ও এলাকাবাসী বলছেন, অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছেলে টাকা না পেয়ে বাবাকে কুপিয়ে ও মাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। অনলাইন জুয়া ও মাদক বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ফরিদপুরের সদর উপজেলার এক তরুণ বলেন, অনলাইন জুয়ার খোঁজ পেয়েছিলেন একটা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। পরে তিনিই তাদের বন্ধুদেরও জুয়ার এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। কারণ বন্ধুদের রেফার করার পর তিনি পেয়েছেন বোনাস। এভাবে তারা একটি চক্রে জড়িয়ে পড়েছেন। এখন চেষ্টা করেও বের হয়ে আসতে পারছেন না। লালমনিরহাটের দুর্গাপুরের আরেক তরুণ বলেন, অনলাইন জুয়া এক ধরনের নেশা। এখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। আমি আসক্ত, চাইলেও ছাড়তে পারছি না। জিতি, হারি আবার খেলি। এখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন।মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অনলাইন জুয়া একটি ডিজিটাল নেশা। জেতার উত্তেজনা ও হারার হতাশা যুবসমাজকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে অপরাধে ঠেলে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনলাইন জুয়া মানসিক নির্ভরতায় রূপ নিলে দিনে অন্তত একবার না খেললে স্বস্তি মেলে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
পুলিশ জানায়, তাদের সাইবার মনিটরিং ইউনিট অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে কাজ করছে। অনলাইন জুয়া পরিবার, তরুণ প্রজন্ম ও দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ হুমকি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সহায়তায় সন্দেহজনক ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্লক করা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গ্যাম্বলিং মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ায় বাজারমূল্যের গ্রাফ ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৪ সালে শুধু অনলাইন জুয়ার বাজারমূল্য ছিল ৭৮.৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিবছর ২০৩০ সালে অনলাইন জুয়ার বাজার হবে ১৫৩.৫৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর ব্যাপ্তি ১১.৯% হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে ঘরবন্দি মানুষ সময় কাটাতে মোবাইলে ব্যাপক হারে অনলাইন জুয়ার নেশায় জড়িয়ে পড়ে। এখন রাজধানীর অভিজাত এলাকা ও জেলা শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও এই নেশা ছড়িয়েছে। তরুণ থেকে মধ্য বয়সীরাও জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন বেটিং সাইটগুলোর মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা
পাচার হয়ে গেছে। ওয়ানএক্সবেট, বেটবাজডট৩৬৫, ক্রিকেক্স, বেট৩৬৫এনআই ও মসবেটসহ বিভিন্ন জুয়ার সাইটের টাকা পাচার হচ্ছে। চক্রগুলো হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। চক্রগুলোর দেশীয় এজেন্টদের মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার করলেও সাইটগুলো দেশের বাইরে থেকে পরিচালনা করায় মূলহোতাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তেমন কেনো ব্যবস্থা নিতে পারে না।্অ্নলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাব। এই ডিসমিসল্যাবের সম্প্রতি এক গবেষণা বলছে, ১১টি সরকারি ওয়েবসাইটে তিন হাজারের বেশি বেটিং ওয়েবপেজের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে সর্বাধিক সার্চ হয় জেটবাজ ডটকম, এরপর জয়া৯ ডটকম ও ক্রিকেস যেভাবে কাজ করে জুয়ার এজেন্টরা : জুয়ার দেশীয় মাস্টার এজেন্টরা তাদের সাব-এজেন্ট নিযুক্ত করে। সাব-এজেন্টরা মানুষকে শেখায় কীভাবে অনলাইনে জুয়ার অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। কীভাবে খেলে লাভ করা যায়। তারপর গ্রাহকরাই তখন প্রচার করে। এভাবে একে একে আস্তে আস্তে গ্রাহক বাড়তে থাকে। একজন এজেন্ট জানান, একজন জুয়াড়ি জুয়া খেলতে যোগাযোগ করেন একজন সাব-এজেন্টের সঙ্গে। জুয়াড়ি হলে তার অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়। টাকার বিনিময়ে সাব-এজেন্ট জুয়াড়ির অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল মুদ্রা জমা হয়। ডিজিটাল মুদ্রা সাব-এজেন্ট পায় মূলত মাস্টার এজেন্টের কাছ থেকে। মাস্টার এজেন্ট এই টাকা পাঠিয়ে দেন দেশের বাইরে থাকা সুপার এজেন্টের কাছে। ১৫ কিংবা ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে চলা প্রতিটি গেমে হাজার হাজার লোক জুয়া ধরে। এভাবে প্রতি ঘণ্টায় জুয়ায় কোটি কোটি টাকা চলে যায় দেশের বাইরে।
মাঠের খেলায় জুয়ার জোয়ার : প্রতিদিন ফুটবল ও ক্রিকেটসহ বিভিন্ন মাঠের খেলায় কোটি টাকার জুয়া হচ্ছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট, ফুটবল, জাতীয় লিগ, ইউরোপ নেশন্স কাপ-উয়েফা, স্পেনিশ লিগ, কোপা আমেরিকা, বিপিএল টুর্নামেন্টে বিনোদনের চেয়ে এখন জুয়া খেলায় মত্ত থাকেন বাজিকররা। ওয়ান এক্স বেট, বেট থ্রি-সিক্সটি-ফাইভ, মোস্ট বেট বিডি, ৯ উইকেটসহ কয়েকশ সাইটে জুয়া চলছে। লেনদেন হচ্ছে বিকাশ, নগদ, রকেট বা ভিসা, মাস্টারকার্ডে। জুয়ার অর্থ ক্রেডিট কার্ড, ই-ব্যাংকিং ও হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে।
জুয়া বন্ধে সরকারি অপ্রতুল পদক্ষেপ : গত কয়েক বছরে প্রায় ৫ হাজার জুয়ার সাইট বন্ধ করেছে সরকার। কিন্তু বিদেশ থেকে পরিচালিত জুয়ার সাইট এদেশে বন্ধ করলেও জুয়াড়িরা ভিপিএন বা অন্য উপায়ে ঠিকই সাইট ব্যবহার করেন। জুয়া পরিচালনাকারী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন চালায়। সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ব্যবহার করছে প্রচারণায়। তবে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ খুবই কম। জুয়ার বিজ্ঞাপন ও সেখানে প্রচার হওয়া মোবাইল নম্বর ধরে আসামিদের গ্রেপ্তারের পদক্ষেপও অপ্রতুল। জুয়ার ভয়াবহতা নিয়ে সরকারের সচেতনতামূলক প্রচারণাও নেই বললেই চলে।



